২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী

ও আমার শারীরিক এবং মানসিক চাহিদা মেটাচ্ছে, বিয়ের রাস্তায় যেতে চাই না

ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮, সময় ৩:০২ অপরাহ্ণ

কেমন হয় ‘সিঙ্গল’ মেয়েদের প্রেম-ভালবাসার জগৎ? হয়ত জানেন কিছুটা, কিন্তু বোঝেন অনেক কম। লেখিকা শ্রীময়ী পিউ কুণ্ডুর নতুন বই ‘স্টেটাস সিঙ্গল’-এ উঠে এল এমন অজানা কাহিনি।

৩৮ বছরের ডিভোর্সি পিয়াসি সেনচৌধুরী। তাঁর থেকে ১০ বছরের বড়, একজন বিবাহিত সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। সহকর্মীরও এর আগে দু’বার ডিভোর্স হয়েছে। মহিলা জানেন, তাঁর বয়ফ্রেন্ড কোনওদিন নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে আসবেন না। কিন্তু তাতেও কোনও অসুবিধা নেই পিয়াসির।

তাঁর কথায়, আমি একা থাকি। ও আমার শারীরিক এবং মানসিক চাহিদা মেটাচ্ছে। এটাই আমার কাছে মুক্ত বাতাসের মতো। আমি আবার বিয়ের রাস্তায় যেতে চাই না।

সম্পর্ক হোক বা সেক্স— টিন্ডারের মতো ডেটিং অ্যাপের যুগে শহুরে একলা মেয়েদের মনের জড়তা অনেকটাই কেটে গিয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইচ্ছেমতো সেক্স-লাইফ ও সম্পর্কের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে।

পিয়াসির মতো মহিলারা কিন্তু অর্থনৈতিক ভাবে তাঁর বিবাহিত বয়ফ্রেন্ডের উপরে নির্ভরশীল নন। নিজেকে ‘সতীন’ হিসেবেও দেখতে চান না বা ‘মিস্ট্রেস’ বলেও মনে করেন না।

শুধু পিয়াসি নন। বেঙ্গালুরুর একটি আর্ট ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ৪৫-বছর বয়সি অরুন্ধতী ঘোষ আবার বিশ্বাস করেন বহুগামিতায়। একই সময়ে একাধিক শহরের একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় তিনি বিশ্বাসী। এটাকে তিনি তাঁর চরিত্রের স্বাভাবিক প্রকাশ বলেই মনে করেন।

পিয়াসি হোন বা অরুন্ধতী, এমন প্রায় তিন হাজার একলা মেয়ের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখিকা শ্রীময়ী পিউ কুণ্ডুর সাম্প্রতিক সাহসী বই ‘স্টেটাস সিঙ্গল’ (প্রকাশক: অ্যামারিলিস)। যিনি নিজেও ৪০-এ পা দিয়েও ‘সিঙ্গল’। কলকাতার মেয়ে শ্রীময়ী এই শহরে বেড়ে উঠলেও দিল্লিতে পরিবারের সঙ্গেই কাটিয়েছেন কর্মজীবনের অনেকটা।

তিনিই বলছেন, তবে এমনটা মনে করার কারণ নেই যে, ‘সিঙ্গল’ মহিলা মানে শুধুই খুল্লামখুল্লা সম্পর্ক আর সেক্সের গল্প। এর বাইরেও একলা মেয়েদের একটা জগৎ রয়েছে। যা আমরা দেখেও দেখি না।

‘শুধুই সিঙ্গল মেয়েদের সেক্স বা প্রেমের জীবন নিয়ে এই বই নয়। আমি তা লিখতেও চাইনি। তাঁদের ইচ্ছে, সমস্যা, দৈনন্দিন খুঁটিনাটি নিয়েই এই লেখা, বলছেন কলকাতার মেয়ে শ্রীময়ী।

তাঁর বইতে শ্রীময়ী লিখেছেন দেশের জনসংখ্যার ২১ শতাংশই ‘সিঙ্গল’ মহিলা। আর এঁদের মধ্যে কেউ নিজের ইচ্ছেতে একলা, আবার কেউ বাধ্য হয়ে।

৩০-এর কোঠায় পা দিয়েও যদি কোনও মেয়ে অবিবাহিত থাকেন, তাহলেই তাঁকে ‘সিঙ্গল’ ধরে নেওয়ার রেওয়াজ ভারতীয় সমাজেই। এখান থেকেই শুরু নানা ‘অত্যাচারের’ কাহিনি।

‘‘গাইনি থেকে শুরু করে আত্মীয়, বাবা-মা,— সবাই ৩০ বছর হয়ে গেলেই হইচই শুরু করে দেয় কেন?’’ প্রশ্ন শ্রীময়ীর।

একদিকে বাবা-মায়ের দেওয়া বিয়ের চাপ, অন্যদিকে বিবাহিত বন্ধুদের অকাতর জ্ঞান। এসবের মাঝে পড়েই ‘অত্যাচারের শুরু’। ‘‘আমার বয়স যখন ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল, তখন কিন্তু এত চাপ সহ্য করতে হয়নি। কোনও পরিবর্তনও হয়নি। কিন্তু ৩০ বছর পেরোতেই জীবন যেন বদলে গেল,’’ বলছেন লেখিকা।

তাঁর ক্ষোভ, ‘সিঙ্গল’ শব্দটা একটা ‘গালাগালির’ মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ।

তখন একা মহিলাদের পক্ষে বাড়ি ভাড়া পাওয়া মুশকিল বা কাজে দক্ষতা থাকলেও শুনতে হয়, ‘বসের সঙ্গে বিছানায় যাওয়ার’ গসিপ।

সেই চাপেই ‘সঠিক পুরুষের’ অপেক্ষায় না থেকেই যেতে হয় ‘সম্বন্ধ করে বিয়ের’ বাজারে। সেখানে অন্য অত্যাচার।

তার পরে ডিভোর্সি, সন্তান নিয়ে থাকা সিঙ্গল মাদার, প্রতিবন্ধী একা মহিলা— সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে একা মহিলাদের রকমফের অনেকরকম।

কিন্তু সব একা মেয়েরাই কী সারা জীবন একা থাকতে চান? শ্রীময়ী বলছেন, আমি তো তিন হাজার মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। একজনও কিন্তু বলেননি যে, তাঁরা একা রয়েছেন কিন্তু মনের মানুষকে খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছেন।

প্রত্যেক মানুষই কারও একটা সঙ্গ চায়। কেউই একা থাকতে চায় না। এখানে ‘একাকিত্ব’-কে কখনই উদযাপন করা হয় না। একাকিত্বকেও ‘সিঙ্গল’-এর মতো ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হয়।

আসলে যাঁরা একলা থাকেন, তাঁরা কোনও না কোনও সময়ে ভালবাসায় নিজের হাত পুড়িয়েছেন। তবুও ভালবাসার মানুষের অন্বেষণ চলতেই থাকে মনের মধ্যে।

‘স্টেটাস সিঙ্গল’-এই উঠে এসেছে ট্রান্সজেন্ডার অপ্সরা রেড্ডি বলছেন, তিনি একজন পুরুষ খুঁজছেন যিনি তাঁকে একটা পরিবার দেবেন। অপ্সরা বাচ্চা ভালবাসেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি ট্রান্সজেন্ডার বলে শুধুই যৌনসম্পর্ক তৈরি করার জন্য পুরুষ খুঁজছেন।

‘যদিও সঙ্গী খোঁজা চলতে থাকে, তার মানে এই নয় যে, তাঁকে কোনও পুরুষই হতে হবে। সে একজন বাচ্চাও হতে পারে, বা আরও একজন মহিলা হতে পারেন— বলছেন লেখিকা।

কিন্তু একটি ভ্যালেন্টাইনস ডে একজন সিঙ্গল মহিলার জন্য কেমন? এই প্রশ্ন করতেই শ্রীময়ী বলছেন, আমি আমার কথা বলতে পারি। আমার খুব ভাল লাগবে যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার ঘর কেউ সাদা লিলি ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে, বিছানার পাশে রেখে দিয়েছে কবিতার বই।

তিনি গত ১০ বছর ধরে একাকী কাটাচ্ছেন ‘ভালবাসার দিন’। তাঁর কাছে ‘‘অপেক্ষার মধ্যেও রয়েছে একটা ভাল লাগা।’’ মনে পড়ে গেল প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতার কথা, যেখানে তিনি বলেছিলেন— অপেক্ষার ভিতরে এত রং, তাই অপেক্ষার রং সাদা। একাকী নারীর অপেক্ষা আসলে অসংখ্য রং বুকে নিয়ে থাকা এক শুচিশুভ্র অস্তিত্ব।

নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই শ্রীময়ী বলছেন, ‘‘প্রত্যেক মেয়েই ভালবাসা খোঁজে।’’

তবে ‘স্টেটাস সিঙ্গল’-এর লেখিকার মতে, প্রেম গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিন্তু নিজেকে ভালবাসা তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সেটাই একলা মেয়েদের মনের জোরের উৎস।

সূত্র: এবেলা