হরমুজে যেকারণে বাংলাদেশি জাহাজকে বাধা দিচ্ছে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বিপাকে পড়েছে আমদানিনির্ভর দেশগুলো, যার প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনো হরমুজ অতিক্রম করতে পারছে না। ফলে কূটনৈতিক জটিলতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জাহাজটির যাত্রা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩৭ হাজার টন সারবোঝাই এই জাহাজটি দুই দফা চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালি পার হতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছাকাছি নোঙর করে অপেক্ষা করছে। দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকার ফলে সরবরাহ চেইন ও নির্ধারিত সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও পরিচালনায় বিদেশি সংস্থা যুক্ত, তবুও জাহাজটির নাবিকরা সবাই বাংলাদেশি। জাহাজটির নির্ধারিত গন্তব্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দর।

এদিকে, জাহাজটিকে দ্রুত হরমুজ প্রণালি পার করানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, ইরানের অনুমোদন পেতে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

যদিও ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনার পিছনে রয়েছে কূটনৈতিক অসন্তোষ। ইরানে হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া তেহরানকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ করেনি। ফলে ইরানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট বা একপেশে বলে প্রতীয়মান হয়।

পরবর্তীতে সংশোধিত বিবৃতিতে খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে। তবে কূটনীতিকদের ধারণা, এই সংশোধন প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। ফলে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়, যার প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়তে শুরু করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানান। তিনি একাধিকবার বলেছেন, বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং এতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ওপর হামলার বিষয়ে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারত। তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী জনমতের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ থেকেও অনুরূপ দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল।

এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে পারত। তার এই মন্তব্য কূটনৈতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েনের ইঙ্গিত বহন করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top