জ্বালানি সংকট কাটাতে বহুমুখী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে অকার্যকর করে রাখার কারণেই দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট ও আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এই সংকট কাটিয়ে দেশকে জ্বালানিতে স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে বর্তমান সরকার বহুমাত্রিক ও সমন্বিত একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মৌখিক প্রশ্নের উত্তরদান পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহতকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার রূপরেখা তুলে ধরেন।

সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জ্বালানি ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আরও সাতটি কূপের খননকাজ চলছে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

নতুন গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করে তুলতে দুটি আধুনিক রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসির (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) আওতায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে এবং অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বহুগুণ বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সামুদ্রিক এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখান থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হবে। এতে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি সক্ষমতা আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে। এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের উত্তরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, জনমনে আগ্রহ তৈরি ও এ খাতের দ্রুত প্রসারে ২০২৬ সালের ৮ জুন এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ সব প্রয়োজনীয় উপাদানের ওপর থেকে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং অতিরিক্ত অগ্রিম আয়করসহ সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রুফটপ সোলার স্থাপনকারীদের জন্য আকর্ষণীয় আর্থিক মডেল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার স্থাপন করবেন, তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনে নেবে। বর্তমানে গড়ে প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ ৬ থেকে ৭ টাকা হওয়ায় এই বাল্ক রেট ও সরকারি প্রণোদনার ফলে উদ্যোক্তারা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত (৪০ শতাংশ মুনাফা ও ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম) নিট মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাবেন, যা পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে সোলার প্যানেল বসাতে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সোলারের পাশাপাশি বায়ুবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


সূত্র: জাতীয় সংসদ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top