জ্বালানি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এখন শুধু বিদ্যুৎ বা পরিবহনের বিষয় নয়, বরং মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছে। শিল্পায়ন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, নগরায়ন এবং যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে পেট্রোল, ডিজেল, এলপিজি এবং এলএনজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতা আমদানিনির্ভরতা। দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির প্রায় সম্পূর্ণটি বিদেশ থেকে আনতে হয়। এর কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় রেকর্ড পরিমাণে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ এবং আমদানি ব্যয়কে প্রভাবিত করে। এর ফলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প সহ সকল খাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, যা শেষপর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ ফেলে।

দেশের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হল পরিশোধন ক্ষমতা। রাষ্ট্রীয় ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন, যা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও সেই সুবিধা সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারা যায় না। এই কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে বৃদ্ধির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালিতে তেল ও এলএনজি পরিবহনে বাধা হলে তেলের দাম, জাহাজভাড়া এবং বিমা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র বা পরিশোধনাগারে আক্রমণ হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং সংঘাত সমাপ্ত হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব কয়েক সপ্তাহ বা মাস স্থায়ী থাকে। বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি কারণ জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ উৎসের বৈচিত্র্য আনা অপরিহার্য। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও চীন থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এলএনজির ক্ষেত্রে কাতারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠছে। এই বহুমুখীকরণকে আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হল পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত। সাম্প্রতিক সংকটে ডিজেল, পেট্রল এবং অকটেনের মজুত স্বাভাবিক মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা এই বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় অন্তত ৯০ দিনের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা অপরিহার্য। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে বাধা দেখা দিলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত খরচে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে না। একইসাথে বেসরকারি শিল্প ও পরিবহন খাতও আগাম সরবরাহ পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

google-site-verification=7TfDG2GxHVLv84lAW9ayn7eU6ZzescHLfgW6R86o7Dk
Scroll to Top