কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের ব্যবসা ঘিরে মদ বিক্রি, আমদানি, শুল্ক-ভ্যাট পরিশোধ এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্স নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যেই রাজধানীর চারটি বার ও রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনুমোদনহীন মদ জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক গোয়েন্দা ইউনিট। একই সঙ্গে অতীতে নিউ জুরাইনে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে চালানো অভিযানের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে মদের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে শেখ নূর ইসলামের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, আইরিশ পাব অ্যান্ড বার তিনি অনেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন এবং বর্তমানে এসব ব্যবসার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স ব্যবহার করে বার পরিচালনা ও তদন্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর নিউ জুরাইনে আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে স্কটল্যান্ড ও লন্ডন থেকে আমদানি করা ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভদকাসহ বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ পাওয়া যায়। এসব মদ আমদানির বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। পরে মদগুলো জব্দ করা হয় এবং কদমতলী থানায় ফৌজদারি মামলা করা হয়।
আইরিশ পাবের কর্মকর্তারা পরে দাবি করেছিলেন, বিদেশি মদগুলো বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে কেনা হয়েছিল। কিন্তু এ দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ তারা দিতে পারেননি। আরও অভিযোগ ছিল, ২০১৬ সালের পুরোনো নথি ব্যবহার করে ২০১৯ ও ২০২০ সালে উৎপাদিত মদ বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। শুল্ক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে মদ সরবরাহের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
আইরিশ পাবের মদ আমদানির ক্ষেত্রে যে লাইসেন্স দেখানো হয়েছিল, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অভিযানকারী এক শুল্ক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই লাইসেন্স মূলত কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ছিল। সেই লাইসেন্স দিয়ে বৈধভাবে মদ আমদানি করা সম্ভব নয়। একই অভিযানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের অনুমোদনবিহীন ৫৭ সেট ওয়াকিটকি পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তদন্তের গতিপথ নিয়েও অভিযোগ ওঠে। শুল্ক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কদমতলী থানায় করা মামলা প্রথমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) এবং পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) যায়। তদন্তে শেখ নূর ইসলামের পরিবারের কানাডার ব্যাংক লেনদেনসহ বিভিন্ন তথ্য উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল বলে তৎকালীন শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, এর ফলে অর্থপাচারের বিষয়টি আর সামনে আসেনি।
আইরিশ পাবের মালিকানা ও পরিবারের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। বলা হয়েছে, শেখ নূর ইসলাম প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী শিলা ইসলাম ছিলেন চেয়ারম্যান এবং মেয়ে দিশা ইসলাম পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের নামে মোট ১০ হাজার শেয়ার থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে এসব শেয়ার অন্য দুই ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নূর ইসলামের হাতেই ছিল।
আইরিশ পাবের কাছাকাছি বুড়িগঙ্গার তীরে একটি গুদাম আছে। এর কাছেই ছিল পানগাঁও কাস্টম হাউস। কয়েকজন শুল্ক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সেখানে অবৈধ মদের চালান আনার অভিযোগের কথা বলা হলেও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে এ অংশটি অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে শেখ নূর ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডসহ চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় এনবিআরের বিভিন্ন গোয়েন্দা ইউনিট। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রে-ক্যানভাস রেস্টুরেন্ট, হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল ও মার্গারিটা লাউঞ্জ। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের উৎস, আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র, পণ্যের বৈধতা এবং শুল্ক, মূসক ও আয়কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা।
এনবিআরের কর্মকর্তারা পরে জানান, ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৩০ বোতল অনুমোদনহীন মদ জব্দ করা হয়েছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রিজভী আহম্মেদ জানান, একটি ছোট কাভার্ড ভ্যানে করে এসব পণ্য প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। সে সময় এনবিআরের দল গাড়িটি আটক করে। জব্দ করা মদের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
অভিযানে ফু-ওয়াং থেকে জিনসেং নামে প্যাকেটজাত পণ্য এবং এক কেজি জাফরানও জব্দ করা হয় বলে জানানো হয়েছে। এসব পণ্যের আমদানি বা ক্রয়ের কাগজপত্রও দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একই দিনে অন্য তিন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন পরিমাণ মদ পাওয়া যায়। মার্গারিটা লাউঞ্জ থেকে ৬০৮ লিটার মদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩৬ লিটার দেশীয় উৎপাদিত পণ্য ছিল। এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ৩৬ লিটারের ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্রও যথাযথভাবে দেখানো হয়নি। বিদেশি মদের পুরো অংশকে অনুমোদনহীন হিসেবে জব্দ করা হয়।
তেজগাঁওয়ের হলিডে ইন ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে পরিচালিত বারের লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন তোলে অভিযানকারী দল। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, সেখানে বারটি হোটেলের নামে নয়, ‘হাবিব হোটেল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গুলশানের রে-ক্যানভাস বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকেও ২৯ লিটার অনুমোদনহীন মদ জব্দ করার কথা জানানো হয়।
এনবিআরের কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, অভিযান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়নি। তাদের কাছে থাকা দাপ্তরিক রিপোর্ট ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে চোরাচালানের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা পণ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানেই অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক।
এদিকে আইরিশ পাবের পুরোনো অভিযান প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান জানিয়েছেন, সেখানে অভিযান হয়েছিল বলে তিনি জানেন এবং সে সময় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি দেখা হবে। অনিয়মের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান। ফলে পুরোনো অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক এনবিআর অভিযানের পর মদের ব্যবসায় বৈধতা, আমদানি নথি, কর-শুল্ক পরিশোধ ও লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া। শেখ নূর ইসলাম পুরোনো আইরিশ পাবসংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং জানিয়েছেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটি আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর পক্ষ থেকে টস বন্ডের মালিকানার অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছে।

