বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর থেকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে দিন কাটছে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে তাঁর অপেক্ষা। উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন (ডেথ রেফারেন্স) ও দণ্ডের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তিনি।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কনডেম সেলে বন্দিজীবনের অধিকাংশ সময় নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে কাটাচ্ছেন মিন্নি। স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগও সীমিত। এদিকে তাঁর জামিনের আবেদনও দীর্ঘদিন ধরে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
রিফাত হত্যা ও মৃত্যুদণ্ডের রায়
২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
ওই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি একই বছরের ৪ অক্টোবর হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মিন্নিসহ ছয় আসামি পৃথক আপিল করেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের জট
মিন্নির মামলার শুনানি বিলম্বিত হওয়ার পেছনে উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক মামলার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
ডেথ রেফারেন্স-সংক্রান্ত আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির জানিয়েছেন, বর্তমানে ২০১৯ সালে হাইকোর্টে আসা ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে আসা রিফাত হত্যা মামলার নথির বর্তমান অবস্থা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে একটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ১৫ থেকে ২০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। এ দীর্ঘসূত্রতার কারণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকার বিষয়টি মানবাধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। তাঁদের মতে, আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকে।
জামিন আবেদনও ঝুলে আছে
মিন্নির আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্নার ভাষ্য অনুযায়ী, সাক্ষীদের বক্তব্যে অসংগতি, শারীরিক অসুস্থতা এবং নারী বন্দি হিসেবে তাঁর পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২২ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট একটি বেঞ্চ আবেদনটির শুনানি করতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে অন্য বেঞ্চে আবেদনটি উপস্থাপন করা হলেও শুনানি পিছিয়ে যায়। এরপর থেকে আবেদনটি কার্যত আর শুনানির তালিকায় আসেনি বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।
মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করে তাঁর মেয়েকে মামলায় জড়িয়েছে। মেয়ের শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি মানবিক বিবেচনায় জামিনের আবেদন জানিয়েছেন। তবে এগুলো তাঁর ও পরিবারের পক্ষের বক্তব্য; মামলার চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
সীমিত সুযোগে কারাগারের দিন
কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে মিন্নিই একমাত্র নারী বন্দি। কারাবিধি অনুসারে সেখানে বন্দিদের নির্ধারিত কক্ষে থাকতে হয় এবং বাইরে চলাফেরার সুযোগ থাকে না। মিন্নি মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। এ ছাড়া সপ্তাহে একবার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ পান।
কারা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মিন্নি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন এবং ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে সময় কাটান। কারাগারে তাঁর আচরণ শান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিফাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ছয় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অনিশ্চিত। ফলে মিন্নির কারাজীবনের পাশাপাশি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতিও আলোচনায় রয়েছে।

