শিশুদের নোবেল নমিনেশন পাওয়া কে এই তামজিদ

মানবিক উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ব্রিটিশ ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ তামজিদ রহমান। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এক স্বজনকে হারানোর পর রক্তদানে মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির লক্ষ্যে ‘ব্লাডলিংক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। রক্তের অভাবে কোনো শিশুর মৃত্যু যেন না হয়, এ লক্ষ্য সামনে রেখে তাঁর উদ্যোগ ইতিমধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

২০২৪ সালের ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হন তামজিদসহ চার বাংলাদেশি তরুণ। অন্য তিনজন হলেন আদিবা বিনতে আহমাদ তুবা, জাওয়াদ আরাফ খান ও শাওন মাহমুদ। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

তামজিদ রহমানের বয়স যখন ১৫ বছর, তখন থ্যালাসেমিয়ায় এক স্বজনকে হারানোর ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ২০২১ সালের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই রক্তের প্রয়োজনে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা শুরু হয় তাঁর। পরে ২০২৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্লাডলিংক ফাউন্ডেশন।

এটি মূলত একটি পিয়ার-টু-পিয়ার রক্তদাতা সংযোগের অ্যাপভিত্তিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে রক্তের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অনুরোধ জানাতে পারেন। নিবন্ধিত রক্তদাতারা সেই অনুরোধ দেখতে পান এবং রক্তের গ্রুপসহ প্রয়োজনীয় শর্ত মিলে গেলে যোগাযোগ করতে পারেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রক্তদাতার সন্ধানে প্রচার চালায় ব্লাডলিংক দল।

তামজিদের মূল লক্ষ্য, রক্ত পরিসঞ্চালনের অভাবে শিশুদের মৃত্যু প্রতিরোধ করা। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজনের সময় রক্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে তাঁর উদ্যোগ।

ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের ২০২৪ সালের সম্মাননাপ্রাপ্তদের তালিকায় ব্লাডলিংক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের সাফল্যও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে ২০ হাজারের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি রক্তদাতা ও রক্তগ্রহীতার মধ্যে ২ হাজার ৫০০টিরও বেশি সংযোগ তৈরি হয়েছে।

দেশজুড়ে রক্তদাতাদের তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার কাজও করছে সংগঠনটি। এতে ৯৫০ জনের বেশি সক্রিয় রক্তদাতার তথ্য রয়েছে। একশর বেশি স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় তরুণদের রক্তদান সম্পর্কে সচেতন করতে কর্মশালা ও প্রচার কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।

তামজিদের এ উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু রক্তদাতা খুঁজে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানে তরুণদের আগ্রহী করে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড প্রয়াত প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানার স্মরণে চালু করা হয়। মানবিক কার্যক্রম, সমাজসেবা এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে অবদান রাখা ৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের এ পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাধারণত অন্তত এক বছর ধরে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির কাজে যুক্ত তরুণদের অবদান মূল্যায়ন করা হয়।

২০২৪ সালে বিশ্বের ৪৫টি দেশের ২০০ তরুণ এ সম্মাননা পান। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের চার তরুণের স্থান পাওয়া দেশের তরুণদের সামাজিক উদ্যোগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তামজিদ রহমানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শোককে সামাজিক উদ্যোগে রূপান্তর করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন একটি উদ্যোগ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছে, যার মাধ্যমে রক্তের প্রয়োজন থাকা মানুষের সঙ্গে সম্ভাব্য দাতাদের যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ব্লাডলিংকের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রক্তদানের সুযোগ বাড়ানো এবং জরুরি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top