চাকরি বাঁচাতে জরায়ু কেটে বাদ দিচ্ছেন শ্রমিকরা

ভারতের আখখেতে কাজের সুযোগ ধরে রাখতে এবং অসুস্থতা বা মাসিকের কারণে কর্মবিরতি এড়াতে জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করাচ্ছেন বহু নারী শ্রমিক। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি, ঋণের বোঝা এবং কাজে অনুপস্থিত থাকলে আর্থিক জরিমানার আশঙ্কা তাঁদের এমন কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের বীড জেলার বহু নারী মৌসুমি কাজের জন্য অন্য এলাকায় পাড়ি জমান। আখ কাটার মৌসুমে তাঁরা কর্ণাটকসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে কাজ করেন। পরিবারের ঋণ পরিশোধ এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁদের দীর্ঘ সময় মাঠে পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু মাসিকের ব্যথা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা গর্ভধারণের কারণে কাজে বিরতি নিলে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি জরিমানার মুখেও পড়তে হয়।

এই পরিস্থিতিতে কিছু নারী মনে করছেন, জরায়ু অপসারণ করলে মাসিকজনিত সমস্যা ও গর্ভধারণের কারণে কাজ বন্ধ রাখার প্রয়োজন কমবে। তবে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক প্রভাব থাকতে পারে। চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া কেবল কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এমন অস্ত্রোপচারের দিকে নারীদের ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

ঋণের ফাঁদে আটকে শ্রমিকদের জীবন

বীড জেলার শ্রমিকদের অনেকেই কাজের সন্ধানে নিজেদের গ্রাম থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে যান। আখ কাটার মৌসুমে তাঁরা সাধারণত স্বামী-স্ত্রী মিলে জুটি হিসেবে কাজ করেন। কাজের ব্যবস্থা করে দেন মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকাদারেরা। যাতায়াতের ব্যবস্থা ও অগ্রিম অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে শ্রমিকদের নির্দিষ্ট সময় কাজ করে সেই অর্থ শোধ করতে হয়।

আখ কাটার শ্রমিকদের দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। দৈনিক মজুরি কখনো ৪০০ ভারতীয় রুপির কাছাকাছি থাকে। নির্ধারিত পরিমাণ আখ কাটতে না পারলে কিংবা কোনো শ্রমিক কাজে অনুপস্থিত থাকলে জরিমানার মুখে পড়তে হয়। ফলে অসুস্থতা বা মাসিকের ব্যথা নিয়েও অনেক নারী কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

কাজের পরিবেশও তাঁদের জন্য কঠিন। অনেক শ্রমিক অস্থায়ী তাঁবুতে থাকেন, যেখানে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আর্থিক অনিশ্চয়তা। চিকিৎসার জন্য কাজ বন্ধ রাখলে আয় কমে যেতে পারে, আবার ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ে।

জরায়ু অপসারণের পরও থাকছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাবিতা নামের এক নারী শ্রমিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। কাজ চালিয়ে যাওয়ার তাগিদে ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর জরায়ু অপসারণ করা হয়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পরও তাঁর রক্তপাত ও ব্যথা অব্যাহত ছিল। পরে পুনেতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তিনি সংক্রমণের কথা জানতে পারেন। অস্ত্রোপচারের নথি চাইলে তা পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, বিশেষ করে কম বয়সে জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচারের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা থাকতে পারে। তাই শুধু কাজের বিরতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই এ ধরনের অস্ত্রোপচার করানো বিপজ্জনক হতে পারে। নারী শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি উদ্যোগেও কাটেনি সংকট

২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের একটি কমিটি বীড জেলার আখ কাটতে যাওয়া ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারীর ওপর জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণ করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচার করানো নারীদের ৪৫ শতাংশের বেশি পরবর্তী সময়ে শারীরিক কিংবা মানসিক সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন।

২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শ্রমিকদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে শ্রমিকদের নিবন্ধন এবং স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সুবিধায় প্রবেশাধিকার উন্নত করার বিষয়ও ছিল। তবে শ্রমিকদের ভাষ্য, বাস্তবে তাঁদের কর্মপরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top