চিনি উৎপাদনে ধারাবাহিক লোকসান থাকলেও মদ বিক্রি ও ডিস্টিলারি ইউনিটের আয় বৃদ্ধির কারণে রেকর্ড মুনাফা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। অন্যদিকে, শুধু ডিস্টিলারি ইউনিট থেকেই করপূর্ব মুনাফা হয়েছে প্রায় ২২৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে ডিস্টিলারি বিভাগে এত বেশি করপূর্ব মুনাফা এর আগে হয়নি।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটি আগের অর্থবছরেও সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ড করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে কেরু।
প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ডিস্টিলারি ইউনিট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ইউনিটের বিক্রি প্রায় ৪৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের ৪৪৪ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো কেরুর মদ বিক্রি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ডিস্টিলারি ইউনিটের করপূর্ব মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় বেড়ে প্রায় ২২৪ কোটি টাকা হয়েছে।
কেরুর বিক্রি ও মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে ২০২১ সালে বিদেশি মদ আমদানিতে সরকারের আরোপ করা কড়াকড়িকে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সিদ্ধান্তের পর দেশে উৎপাদিত মদের চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মদ বাজারজাতকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি সরাসরি উপকৃত হয়েছে।
ডিস্টিলারি ইউনিটের আয় বৃদ্ধির ধারাও অব্যাহত রয়েছে। কোম্পানির আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, টানা চতুর্থ অর্থবছরের মতো এই ইউনিটের আয় ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একইভাবে টানা পঞ্চম অর্থবছরের মতো এর নিট মুনাফা ১০০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। কেরুর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান জানিয়েছেন, চাহিদা বাড়ার কারণে বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার সঙ্গে মুনাফাও বেড়েছে।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবের আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষা তখনো শেষ হয়নি। ফলে প্রকাশিত অঙ্কগুলোকে চূড়ান্ত নিরীক্ষিত হিসাব হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ডিস্টিলারি ইউনিটে বড় অঙ্কের মুনাফা হলেও কেরুর চিনি কারখানার আর্থিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিনি উৎপাদন বিভাগে সম্ভাব্য লোকসান দেখানো হয়েছে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পুরোনো যন্ত্রপাতি, আখের মান এবং চিনি উৎপাদনের সময় আখ থেকে চিনি পাওয়ার হার কম থাকা লোকসানের অন্যতম কারণ। চিনি উৎপাদন বিভাগের আয় ও ডিস্টিলারি ইউনিটের মুনাফার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় সামগ্রিক লাভের হিসাবেও এর প্রভাব পড়ছে।
লোকসান কমাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দ্বিতীয় চিনি ইউনিট সম্প্রতি চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর প্রত্যাশা, নতুন ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হলে চিনি উৎপাদনের লোকসান কমানো যাবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক খামার ও জৈব সার উৎপাদনের মতো অন্যান্য ব্যবসায়িক খাত থেকেও আয় বাড়ছে।
১৯৩৮ সালে দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনি ও ডিস্টিলারি কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে চিনি ও মদ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ, বাণিজ্যিক খামার এবং জৈব সার উৎপাদনের ইউনিট রয়েছে। আখের উপজাত ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য তৈরিও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার অংশ।
কেরুর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, সব ইউনিট মিলিয়ে নিট মুনাফা ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা হলেও চিনি বিভাগের লোকসান প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ডিস্টিলারি ইউনিটের আয় ও মুনাফা বৃদ্ধি সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলকে শক্তিশালী করেছে।
সব মিলিয়ে, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্রে দুটি ভিন্ন প্রবণতা স্পষ্ট। ডিস্টিলারি ব্যবসায় রেকর্ড সাফল্য এবং চিনি উৎপাদনে দীর্ঘস্থায়ী লোকসান। ডিস্টিলারি ইউনিটের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি চিনি কারখানার উৎপাদন ব্যয় ও লোকসান কমাতে পারলে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নতুন চিনি ইউনিট চালুর ফলে লোকসান কতটা কমে, তা বোঝার জন্য পরবর্তী সময়ের উৎপাদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফলের দিকে নজর রাখতে হবে।

