থাকেন ইউরোপে, বিমানে দেশে এসে ‘ভাড়ায়’ ডাকাতি করেন তিনি!

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানা গেছে, এসব চক্রের কিছু সদস্য বিদেশ থেকে বিমানে এসে ডাকাতিতে অংশ নেন। অপরাধ সংঘটনের পর আবার বিদেশে ফিরে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের গাড়ি থামিয়ে টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করার অভিযোগ উঠেছে চক্রগুলোর বিরুদ্ধে।

বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এসব অপরাধী চক্রে দেশের ভেতরে ও বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কেউ বিদেশ থেকে এসে সরাসরি ডাকাতিতে অংশ নেন, আবার কেউ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাড়ায় এসে দলে যোগ দেন। অভিযান শেষে তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান। ফলে তাঁদের শনাক্ত করা ও গ্রেপ্তার করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

বিদেশে অবস্থান করেও অপরাধে জড়ানো

তদন্ত প্রতিবেদনে বাগেরহাটের সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে। তিনি ফ্রান্সে থাকেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ফ্রান্স থেকে বিমানে ভারতে এসে সীমান্তপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করতেন। এরপর শ্যালক শামীমসহ অন্যদের নিয়ে ডাকাতিতে অংশ নিয়ে একই পথে আবার ফ্রান্সে ফিরে যেতেন।

রাজধানীর উত্তরায় একটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হাতে নাসির গ্রেপ্তার হন। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে আরও বলা হয়েছে, এসব চক্রের সদস্যরা সাধারণ ডাকাতির জন্য পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চোরাচালানের বড় স্বর্ণের চালান লুটের ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

বিদেশগামী যাত্রীও হচ্ছেন লক্ষ্যবস্তু

বিমানবন্দর এলাকায় যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষও এ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছেন বলে বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান কুষ্টিয়ার মো. রাশেদুল ইসলাম। বিদেশযাত্রার আগে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে তিনি একটি বাসে ওঠেন।

বাসটিতে আগে থেকেই যাত্রীবেশে পাঁচ থেকে ছয়জন ডাকাত অবস্থান করছিলেন। তারা বাসের দরজা বন্ধ করে রাশেদুলের চোখ ও মুখ বেঁধে মারধর করেন। পরে তাঁর সঙ্গে থাকা মালামাল লুট করে তাঁকে এমইএস ফ্লাইওভারসংলগ্ন জসিমউদ্দীন গোলচত্বর এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়।

এ ধরনের ঘটনায় বিদেশগামী যাত্রীরা বিশেষ ঝুঁকিতে পড়ছেন। কারণ, তাঁদের কাছে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, পাসপোর্ট ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী থাকতে পারে। ফ্লাইট ধরার তাড়া থাকায় অনেক ভুক্তভোগী তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও পান না।

পুলিশের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর ও উত্তরা এলাকায় অপরাধ সংঘটনের পর অভিযুক্তরা দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যান। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হলেও কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে পুলিশের নিয়মিত তৎপরতায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ডাকাতির ঘটনা অনেকাংশে কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীরা কৌশল ও স্থান পরিবর্তন করে অপরাধের চেষ্টা করায় এসব ঘটনা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তৎপরতা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা

বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধের অভিযোগে যাত্রীদের নিরাপত্তা, সীমান্ত নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। বিশেষ করে পুলিশের পরিচয়ে গাড়ি থামানো বা যাত্রীদের আটক করার অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিমানবন্দর ও সীমান্তে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অপরাধের মামলাগুলোর যথাযথ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব চক্রের প্রকৃত সদস্যসংখ্যা, সাম্প্রতিক অপরাধের মোট সংখ্যা এবং বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও যাচাইকৃত তথ্য প্রয়োজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top