বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ হিসেবে কুমির ও বিষধর সাপ ব্যবহারের কথা ভেবে দেখছে ভারত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) নদীবেষ্টিত ও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের পদক্ষেপের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বড় একটি অংশে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও নদী, জলাভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলে তা নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এবং স্থানীয়দের আপত্তির কারণে এসব এলাকায় বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই ‘ভয়ংকর প্রাণীর উপস্থিতি’কে অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই ধারণা সামনে আসার পরপরই মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দার বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসন সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক ও আইনি পথ বাদ দিয়ে এ ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করা অমানবিক এবং সভ্য রাষ্ট্রের নীতির পরিপন্থী। তাঁর মতে, এটি মানুষের জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
একইভাবে বিশ্লেষক অংশুমান চৌধুরি এই প্রস্তাবকে ‘এটি কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এক ভয়ংকর ধারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কুমির বা সাপ কোনো সীমান্ত চেনে না এবং ভারতীয় না কি বাংলাদেশী এমন পার্থক্য করতে পারবে না। ফলে উভয় দেশের সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষই ঝুঁকিতে পড়বেন।
মানবাধিকারকর্মীরা আরও মনে করছেন, এ ধরনের উদ্যোগ কেবল নিরাপত্তা ভাবনা নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যুটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমালোচকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরাও প্রস্তাবটির কঠোর সমালোচনা করেছেন। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা রথীন বর্মন জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী অধিকাংশ নদীতে স্বাভাবিকভাবে কুমিরের বসবাস নেই। এসব প্রাণীকে নতুন পরিবেশে ছেড়ে দিলে তারা টিকতে নাও পারে, ফলে প্রাণহানি ঘটার পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একইভাবে বিষধর সাপ ছড়িয়ে পড়লে তা সীমান্তের বাইরেও আশপাশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে এসব প্রাণী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে সীমান্তবর্তী এলাকার জেলে, কৃষক ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক বিশ্বে সীমান্ত সুরক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে হিংস্র প্রাণী ব্যবহারের কোনো বাস্তব নজির নেই। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ধারণা আলোচনায় এলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগের চেয়ে বিতর্ক ও উদ্বেগই বেশি তৈরি করেছে।

