কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের কানাডায় ব্যবসা, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন কানাডীয় ব্যাংক হিসাবে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলারের বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
তদন্তে প্রায় এক দশকের ১৬৩টি আর্থিক নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব নথিতে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেনের তথ্য রয়েছে। নথিতে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন, দুটি সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টা, ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন এবং ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, সিঙ্গাপুর ডলার ও থাই বাথেও লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে কর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব আর্থিক অনুসন্ধানের সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। তাঁদের ভাষ্য, সালমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আগেই নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নূর ইসলাম পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে শেখ নূর ইসলামের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী শীলা ইসলাম এবং দুই মেয়ে দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামও রয়েছে। কানাডায় তাঁদের একাধিক ব্যাংক হিসাব ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক হিসেবে পরিবারের চার সদস্যের নাম থাকার কথা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নূর ইসলামকে ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দেখানো হয়েছে। তাঁর ব্যবসা ও পেশার সঙ্গে রিয়েল এস্টেট ব্যবস্থাপনা এবং ‘জুম জুম পিৎজা’র মালিকানার তথ্যও পাওয়া গেছে।
কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে পরিবারের সদস্যদের একক ও যৌথ হিসাব থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। এর মধ্যে টরন্টো-ডোমিনিয়ন ব্যাংক, ব্যাংক অব মন্ট্রিল ও টিডি ব্যাংকের হিসাব রয়েছে। শীলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাবের তথ্যও তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে পাওয়া গেছে। পরিবারের সম্মিলিত লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৯ কানাডিয়ান ডলার বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কর নথিতেও শেখ নূর ইসলামের ব্যবসা ও সম্পদের তথ্য রয়েছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেখানো হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা হয়েছে। একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স হিসেবে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আনার তথ্য দেখানো হয়েছে। ওই অর্থবছরে পরিশোধিত আয়কর ছিল ৬৯ লাখ টাকা।
কর নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশে শেখ নূর ইসলাম একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ডমিনোজ পিৎজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, রেডিও মাসালা, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং টিম হর্টনসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর পরিচালক হিসেবে সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। বর্ষা মানি চেঞ্জিং সেন্টার, বর্ষা ডেইরি ফার্ম ও বর্ষা ফিশারিজের সঙ্গেও তাঁর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার কথা কর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর নথিতে কানাডার ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট’, ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’ এবং ঢাকার ‘টস বন্ড’-এর নাম পাওয়া যায়নি। কানাডার নাগরিকত্বের তথ্যও এসব নথিতে উল্লেখ নেই বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিদেশে থাকা সম্পদ ও আয় কর নথিতে যথাযথভাবে দেখানো হয়েছে কি না, সেটিও এখন অনুসন্ধানের অংশ।
এর মধ্যেই শেখ নূর ইসলামের মালিকানাধীন ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এর চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করার ঘটনা সামনে এসেছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দক্ষিণ গুলশানে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-১-এর যৌথ দল অভিযান চালায়। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত ওয়্যারহাউসের সংখ্যা দুটি হলেও সরেজমিনে চারটি ওয়্যারহাউসে পণ্য মজুতের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদনের বাইরে থাকা ওয়্যারহাউসে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য সংরক্ষণের অভিযোগের পর চারটি গুদামই সিলগালা করা হয়। এনবিআর জানিয়েছে, শুল্কমুক্ত পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া বা খোলাবাজারে বিক্রির আশঙ্কা এবং বিষয়টি তদন্তের স্বার্থে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের কানাডার আর্থিক লেনদেন, বিদেশে ব্যবসা ও সম্পদের তথ্য এবং বাংলাদেশে থাকা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এখন কর ও গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। একই সময়ে তাঁর মালিকানাধীন ওয়্যারহাউস নিয়ে শুল্কসংক্রান্ত অভিযান ও সিলগালার ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান ও যাচাই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

