জুতাপেটার শিকার সেই নারী শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত

রাজশাহীতে সম্প্রতি এক নারী শিক্ষককে জুতাপেটা করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালনকারী ওই শিক্ষককে জনসমক্ষে অপদস্থ করা হয় এবং এক পর্যায়ে তাকে জুতাপেটার শিকার হতে হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ১১টার দিকে দাওকান্দি সরকারি কলেজে একটি তাফসির মাহফিলের আয়োজকেরা গিয়েছিলেন। এই আয়োজকেরা ছিলেন বিএনপির নেতা-কর্মী। এ সময় কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয় এবং অভিযোগ ওঠে, এক পর্যায়ে আলিয়া খাতুন দুইজনকে চড় মারেন।

পরবর্তীতে মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপির কর্মী শাহাদাত আলী কলেজে এসে আলিয়ার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। আলিয়ার দাবি, শাহাদাত তার উদ্দেশে অশালীন মন্তব্য করলে তিনি প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তাকে চড় মারেন। এর জেরে শাহাদাত আলী ক্ষিপ্ত হয়ে জুতা খুলে তাকে মারধর করেন।

ঘটনার কিছুক্ষণ পর শাহাদাত আলীর ছেলে লিটন এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মাহবুব ঘটনাস্থলে এসে আবারও হামলায় করেন। তারা দ্বিতীয় দফায় অধ্যক্ষ ও প্রদর্শককে মারধর করেন বলে জানা যায়। এরপর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মী কলেজে এসে উপস্থিত হন। তারা তৃতীয় দফায় অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান এবং অধ্যক্ষসহ আলিয়া খাতুনের ওপর আবারও হামলা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হলেও, এই ঘটনার মাধ্যমে একটা প্রশ্ন উঠে যে, সেই সম্মান কি আসলেই শিক্ষকরা পান?  বিশেষ করে একজন নারী শিক্ষককে এভাবে অপদস্থ করা সমাজের জন্য লজ্জাজনক। অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।

এ বিষয়ে পরিচালক মোহা. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে আলিয়া খাতুনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্গাপুরের মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদন আজ রোববারের মধ্যেই জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। ওই প্রতিবেদন এবং অধ্যক্ষ ও অভিযুক্ত শিক্ষক আলিয়া খাতুনের পৃথক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

অন্যদিকে, ঘটনার মূল অভিযুক্ত শাহাদাত আলীকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ তৎপরতা চালাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে আগেই একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সেই পরোয়ানা মাথায় নিয়েই তিনি কলেজে প্রবেশ করেন এবং এক পর্যায়ে জুতা খুলে শিক্ষককে মারধর করেন।

ঘটনার পর থেকে অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক ও শিক্ষক আলিয়া খাতুন কেউই কলেজে অনুপস্থিত রয়েছেন। প্রথমদিকে অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার দিন তার মোবাইল ফোনটি ভেঙে ফেলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন তিনি হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যান।

পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালকের কার্যালয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, কোনো শিক্ষকের ওপর এমন হামলা তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি অনলাইনের মাধ্যমে দুর্গাপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। সরাসরি মামলা করে সেখানে নিরাপদে থাকা কঠিন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, কলেজের পুকুর যিনি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করছেন, তিনি নিয়ম অনুযায়ী তা করছেন না এবং প্রতিষ্ঠানকে কোনো অর্থও দিচ্ছেন না।

অন্যদিকে, প্রদর্শক আলিয়া খাতুন জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বর্তমানে তিনি একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আছেন। তার শারীরিক অবস্থা এখনও কর্মস্থলে ফেরার মতো নয়। তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা চিন্তা করছেন।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার জানিয়েছেন, শাহাদাত আলীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং তাকে ধরতে পুলিশ কাজ করছে। তাকে পাওয়া গেলে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক কিংবা আলিয়া খাতুন থানায় আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি বলে তিনি জানান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top