বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে সামাজিক সুরক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভাষণে তিনি দেশের সব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সমন্বয় করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানানোর পাশাপাশি এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুফল বিশ্বজুড়ে সমানভাবে পৌঁছে দিতে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান।
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায়। এ লক্ষ্যেই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।’ এর ধারাবাহিকতায় তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা “ফ্যামিলি কার্ড”কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে সরকার। পাশাপাশি ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন কার্ড চালু করা হয়েছে। এসব কার্ড সমন্বয় করে একটি “ইউনিভার্সাল কার্ড” চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রসঙ্গে ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়বে। বিশ্ব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।’ বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে। আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি, যাতে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ পিছিয়ে না থাকে। এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।’ তার ভাষ্যে, এই সংকটের উৎস ও উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও নিহিত সেখানেই এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে প্রত্যাবাসনই এর একমাত্র সমাধান। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন চান তিনি, পাশাপাশি প্রত্যাবাসন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জীবনরক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে বাংলাদেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশের ভূমিকা সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকেই। এ প্রেক্ষাপটে ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে এবং বন্যা-খরার প্রভাব মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

