ব্রেক্সিটের এক দশক পর আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যুক্তরাজ্যের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা প্রয়োজন এবং এর মধ্যে ইইউর পূর্ণ সদস্যপদে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিও থাকতে পারে। তাঁর এমন বক্তব্যের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ প্রকাশ্যে এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও যুক্তরাজ্য আবার ইইউতে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিলে সেটিকে স্বাগত জানানোর কথা বলেছেন।
বুধবার স্পেনের মাদ্রিদে সানচেজের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে মাখোঁকে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, ব্রিটিশরা যদি ফিরে আসতে চায় এবং প্রধানমন্ত্রী সে পথে এগিয়ে যান, তাহলে সেটি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ, উভয়ের জন্যই ভালো খবর হবে। সানচেজও একই ধরনের অবস্থান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্য পুনরায় সদস্যপদের আবেদন করলে স্পেন তা স্বাগত জানাবে।
এর আগে লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে বার্নহাম বলেন, ব্রেক্সিটের পর ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ককে নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তিনি সিঙ্গেল মার্কেট ও কাস্টমস ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা থেকে শুরু করে ইইউর পূর্ণ সদস্যপদে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা পর্যন্ত বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনার কথা বলেন। তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ইইউতে ফেরার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি; বরং কোন পথ বাস্তবসম্মত এবং প্রতিটি সুবিধা ও অসুবিধা যাচাই করার কথা বলেছেন।
বার্নহামের বক্তব্যের পর ব্রেক্সিট বিতর্কও আবার ব্রিটিশ রাজনীতির আলোচনায় এসেছে। ২০১৬ সালের গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর ২০২০ সালে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে ব্রেক্সিট নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
জুনের শুরুতে ইউগভের পরিচালিত এক জরিপে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। বিপরীতে ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ব্রেক্সিট সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। ২০২২ সালের গ্রীষ্মের পর থেকে ইউগভের জরিপগুলোতে ব্রেক্সিটকে ভুল মনে করা মানুষের হার ৫০ শতাংশের নিচে নামেনি। একই সময়ে ব্রেক্সিটকে সমর্থনকারীদের হারও কমেছে; ২০২৬ সালের মে মাসে তা ২৯ শতাংশে নেমে আসে।
তবে যুক্তরাজ্য সরাসরি ইইউতে ফিরে যাবে কি না সে প্রশ্নে জনমত একেবারে একমুখী নয়। ইউগভের সর্বশেষ জরিপে ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা নীতিগতভাবে ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং ৩৪ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু সদস্যপদ ফিরে পেলে যুক্তরাজ্য আগের মতো বিশেষ কিছু ছাড় বা স্বাতন্ত্র্য সুবিধা পাবে না, এমন শর্ত যুক্ত করা হলে ইইউতে ফেরার সমর্থন কমে ৩৫ শতাংশে নেমে আসে এবং বিরোধিতা বেড়ে ৪৩ শতাংশ হয়।
অন্যদিকে, মে মাসে ওপিনিয়ামের জরিপে ৩৬ শতাংশ ব্রিটিশ প্রাপ্তবয়স্ক ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন। আরও ২১ শতাংশ ইইউর বাইরে থাকার পক্ষে থাকলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বর্তমানের তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা বলেছেন। একই মাসে ইপসোসের জরিপে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে গণভোট হলে তাঁরা এর পক্ষে ভোট দেবেন। নিশ্চিত ভোটারদের মধ্যে এই হার ছিল ৫৮ শতাংশ।
বয়সভেদেও মতের পার্থক্য দেখা গেছে। ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ইইউতে ফেরার পক্ষে সমর্থন ছিল ৬৮ শতাংশ। ৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ৫৮ শতাংশ এবং ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ। রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে বার্নহামের বক্তব্যের সমালোচনাও এসেছে ব্রেক্সিটপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। রিফর্ম ইউকে ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা তাঁর অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন। ফলে ব্রিটেনের সঙ্গে ইইউর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আবারও জোরালো হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। সম্মেলনে বাণিজ্য, খাদ্য ও প্রাণী নিরাপত্তা, যুব চলাচল এবং কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সম্মেলনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

