নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে প্রতি সিলিন্ডারে, ভারতে কেন দাম অর্ধেকের চেয়েও কম

রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি নিয়ে নতুন করে চাপে পড়েছেন দেশের ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। ফলে নির্ধারিত দামের তুলনায় ভোক্তাকে কয়েক শ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম এখন ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। অথচ প্রতিবেশী ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এর দাম তুলনামূলকভাবে কম। ভারতের কলকাতায় প্রতি কেজি এলপিজির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৭ টাকা। শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও ১২ কেজির সমপরিমাণ সিলিন্ডারের দাম বাংলাদেশে নির্ধারিত দামের তুলনায় কম। পাকিস্তানেও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম হিসাব করে দেড় হাজার টাকার কিছু কম পড়ে।

দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। ২০১৫ সালের পর বাসাবাড়িতে নতুন করে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ থাকায় এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে এই জ্বালানির দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।

সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এলপিজি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি কোম্পানি সরবরাহ কমাতে শুরু করে। প্রথম দিকে সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো হলেও পরে তা ৫০ শতাংশের বেশি কমে যায়। এতে বাজারে সিলিন্ডারের ঘাটতি তৈরি হয় এবং দাম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ঢাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

তবে এলপিজি আমদানি কমেছে, এমন তথ্য ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। সংগঠনটির হিসাবে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। এ কারণে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি না করার জন্য ব্যবসায়ীদের সতর্কও করা হয়েছে।

এলপিজির দাম বেশি হওয়ার পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে গভীর সমুদ্রে এলপিজি আমদানির টার্মিনাল নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত সক্ষমতাও তৈরি হয়নি। ফলে ছোট জাহাজে করে এলপিজি আমদানি করতে হয়, এতে পরিবহন ও জাহাজভাড়া বেড়ে যায়। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও বলেছেন, অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে দাম কমানো সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, পর্যাপ্ত আমদানি থাকা সত্ত্বেও বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। তিনি মজুত করে রাখা এলপিজি শনাক্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন।

এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু রান্নার খরচেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি গ্যাসের খরচ সংসারের অন্যান্য ব্যয়েও টান তৈরি করছে। বাজারদরের চাপে অনেক শ্রমজীবী পরিবার খাবারের তালিকা সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছে। আগে নিয়মিত ডিম, মাছ বা মুরগি খেতে পারলেও এখন অনেক পরিবার ভাত, ডাল, আলুভর্তা কিংবা শাক-সবজির ওপর বেশি নির্ভর করছে।

বাজার পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার দামের পার্থক্য। বরিশালের একটি দোকানে ১২ কেজির কয়েকটি এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৭০ থেকে ১ হাজার ৯২০ টাকার মধ্যে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে নির্ধারিত দামের বাইরে ঢাকায় কেন অতিরিক্ত কয়েক শ টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের এই ব্যবধান তাই শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিইআরসি বলছে, সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কোম্পানিগুলোর আমদানি ও সরবরাহের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সরবরাহ বাড়লে বাজারের অস্থিরতাও ধীরে ধীরে কমবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top