যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান হারাল বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান হারিয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের রপ্তানি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে চীন। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে। অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৫৬৩ কোটি ৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। চীনের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমলেও দেশটি বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে।

এর আগের বছরের শুরুতে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশ চীনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠেছিল। ওই দুই মাসে বাংলাদেশ ১৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। যদিও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি তখনও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছিল। একই সময়ে চীনের রপ্তানি আরও বড় হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে।

পরবর্তী মাসগুলোতে চীনের রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানো এবং বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। আট মাসের হিসাবে চীনের রপ্তানি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২৩ কোটি ডলার বেশি হয়েছে। ফলে বছরের প্রথম দিকে পাওয়া দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ।

তবে শুধু বাংলাদেশের রপ্তানিই কমেনি। চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক তৈরি পোশাক আমদানিও কমেছে। অটেক্সার হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে দেশটির ব্যবসায়ীরা মোট ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। আগের বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি ৮২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এই বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে ভিয়েতনাম তার অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে দেশটির রপ্তানিও কিছুটা কমেছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটির রপ্তানি ছিল ১ হাজার ১০৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার। অর্থাৎ ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ।

পোশাকের সংখ্যার হিসাবেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে ১৭৫ কোটি ৫৬ লাখ পিস পোশাক গেছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৮০ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার পিস। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ।

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাসের রপ্তানিও কমেছে। বিপরীতে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ ও ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার চিত্রও পরিবর্তিত হচ্ছে।

রপ্তানির পাশাপাশি পোশাকের ইউনিট মূল্যেও পরিবর্তন এসেছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পোশাকের ইউনিট মূল্য কমেছে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একই সময়ে চীনের ইউনিট মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ভিয়েতনামের কমেছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর ফলে কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে চীন প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করেছে বলে রপ্তানিকারকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এবং দেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই বাজার থেকে আসে। ফলে সেখানে অবস্থান হারানোকে শিল্পসংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গত কয়েক বছরের হিসাবেও ওঠানামা দেখা যায়। ২০২২ সালে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৯৭৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি। পরের বছর রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে ৭২৯ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৪ সালে তা সামান্য বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলার হয়। এরপর ২০২৫ সালে রপ্তানি প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ৮২০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়েছে। পাশাপাশি চীন কম দামে পোশাক রপ্তানি করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনও বাজারের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটও রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহের সংকটে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে পোশাক কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় কাপড় সময়মতো না পাওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রভাব পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান না হলে আগামী মাসগুলোতেও নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের আরেকটি দিকও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৯০ কোটি ডলারের বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। এপ্রিল-জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৯ কোটি ৬ লাখ ডলারে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি বেড়েছে ১১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানিতে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিটুমিনসহ খনিজ জ্বালানি ও তেলজাত পণ্য। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ডলার। প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top