কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। নিহত কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনের প্রতি লোভ থেকে অপরাধটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হলেও তদন্তে ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তাজমিনকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করার কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন সুমন। পুলিশ জানায়, ঘটনার পর তিনি পাশের এলাকার একটি পুকুরে গিয়ে গোসল করেন এবং নিহতের ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে সেখান থেকে চলে যান। পরে ফোনটি একটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন বলে তদন্তে জানা গেছে।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাজমিনের মরদেহ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে সে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল।
গত ৭ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় তাজমিন। রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নেমে সে বাসায় ফেরার চেষ্টা করে। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজে তাকে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সে বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে।
কিন্তু বাসায় ফেরা হয়নি তার। পরদিন, ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের কাছেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
অটোরিকশার সূত্র ধরে চালক শনাক্ত
ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিকের পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। পরে মালিকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন। এরপর তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে ঘটনার আগে ও পরে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে আরও যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজার সফরের কারণ এবং সেখানে কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
তাজমিনের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
কিশোরী তাজমিনের মৃত্যুতে তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। অপরাধের প্রকৃত কারণ, ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে হবে।

