আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় কি আপস সম্ভব?

আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা ফৌজদারি মামলায় বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে সেটি কি আদালতে মামলার পরিণতি বদলে দিতে পারে? এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে মামলার ঘটনায়। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ সম্প্রতি আদালতে একটি আপসনামা দাখিল করেছেন। সেখানে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম জামিন পেলে তাঁর আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু এ ধরনের আপসনামা দাখিল করলেই আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা আইনগতভাবে শেষ হয়ে যায় না।

বিষয়টি বুঝতে হলে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার পার্থক্যও জানা প্রয়োজন। হত্যা, চুরি, ধর্ষণ, প্রতারণা কিংবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো অপরাধের অভিযোগে যে মামলা হয়, সেগুলো ফৌজদারি মামলা। এসব মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনে নির্ধারিত শাস্তি হতে পারে। অন্যদিকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পত্তি, পাওনা টাকা, অধিকার কিংবা চুক্তিসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে যে মামলা হয়, সেগুলো দেওয়ানি মামলার আওতায় পড়ে।

বাংলাদেশের আইনে কিছু ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে পক্ষগুলোর মধ্যে আপসের সুযোগ রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় কোন কোন অপরাধ আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে, তার বিধান দেওয়া আছে। এর মধ্যে সাধারণ আঘাত, বেআইনিভাবে বাধা বা আটক, চুরি, কিছু ধরনের প্রতারণা, মানহানি এবং ভয়ভীতি দেখানোর মতো কয়েকটি অপরাধ রয়েছে। কোনো কোনো অপরাধে বাদী নিজে আপস করতে পারেন, আবার কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হয়।

তবে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এই তালিকার মধ্যে নেই। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে এবং অন্য কেউ তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তা করলে ওই ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় ৩০৬ ধারার অপরাধকে আপসযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণেই আইনজীবীদের মতে, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা সাধারণভাবে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হারুণ অর রশিদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাদী আসামির সঙ্গে সমঝোতা করলেও আদালত সেই আপসনামা গ্রহণ করতে বাধ্য নন। একইভাবে শুধু বাদীর সম্মতির কারণে আসামিকে জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রেও আদালতের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না। মামলাটি কোন পর্যায়ে আছে, তদন্তে কী পাওয়া যাচ্ছে এবং অন্যান্য আইনগত বিষয় বিবেচনা করেই আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালতে আপসনামা দাখিল করা এবং আইনগতভাবে মামলা আপস হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। যেসব অপরাধ আইনে আপসযোগ্য, সেসব মামলায় দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছালে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আপসনামা আদালতে উপস্থাপন করা হয়। আদালত দেখেন, সমঝোতাটি পক্ষগুলোর সম্মতিতে হয়েছে কি না এবং তা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। আদালত অনুমোদন দিলে তখন সেই আপস আইনগত কার্যকারিতা পেতে পারে।

কিন্তু যে অপরাধ আইন অনুযায়ী আপসযোগ্য নয়, সেখানে বাদী-আসামির মধ্যে লিখিত সমঝোতা হলেই মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। আইনজীবীদের বক্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের মতো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল, মাকছুদা এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

এরপর আদালতে দাখিল করা আপসনামায় মরিয়মের বাবা তাঁর মেয়ের সংসারজীবন সম্পর্কে একটি ভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, মরিয়ম গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে সংসার করছিলেন। মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহের ভিত্তিতে মামলা করা হলেও পরে তিনি জানতে পারেন, গাজী নজরুল বা তাঁর প্রথম স্ত্রীর প্ররোচনায় কিংবা তাঁদের প্রতি রাগ-অভিমান থেকে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি। দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে পারিবারিক শান্তি ও সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য আপসের কথা বলা হয়েছে।

তবে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, এ ধরনের মামলায় আদালতে এসে বাদীর আপসনামা দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলা হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদন দেবেন এবং আসামিকে জামিন দেওয়া হবে কি না, সেটি আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানও বলেছেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে সমঝোতা হলেও সেটিকে আসামির জামিনের সরাসরি ভিত্তি হিসেবে দেখা যায় না। তাঁর মতে, মামলায় আপস হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে সাক্ষীদের ভূমিকার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আপসের পর সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী হন বা দুর্বল সাক্ষ্য দেন। এর ফলে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে মামলাটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top