ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি থামছে তাহলে?

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সমঝোতা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা, যুদ্ধবিরতির আলোচনা এবং পারমাণবিক ইস্যুকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়ে গেছে গভীর অবিশ্বাস, সামরিক হুমকি এবং রাজনৈতিক চাপ। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি সত্যিই থামতে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবল আরেকটি সাময়িক কূটনৈতিক বিরতি?

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ পাঠিয়েছে, যা বর্তমানে তেহরান পর্যালোচনা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত সমঝোতা হতে পারে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে আশাবাদ তৈরি করলেও একই সঙ্গে তিনি হুমকিও দিয়েছেন যে, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে দেশটিতে আরও তীব্র বোমাবর্ষণ চালানো হবে।

একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে সামরিক হুমকি এই দ্বৈত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নীতির প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান দীর্ঘমেয়াদে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের জন্য তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো উন্মুক্ত করুক।

প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলার ছাড় করবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা বিধিনিষেধও তুলে নেওয়ার আলোচনা চলছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো চায় এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরুক।

তবে ইরান এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এখনো বিবেচনাধীন এবং পর্যালোচনার পর ইরান তাদের অবস্থান জানাবে। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্যরা এই প্রস্তাবকে একতরফা বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে যা অর্জন করা যায়নি, যুক্তরাষ্ট্র এখন তা আলোচনার টেবিলে আদায় করতে চাইছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধ বন্ধে তারা প্রস্তুত, তবে দেশের জনগণের অধিকার নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে, যা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। দেশটি আশঙ্কা করছে, চুক্তির মাধ্যমে তারা যদি পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছাড় দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পশ্চিমা চাপ আরও বাড়বে। আবার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বস্তির জন্যও দেশটির কূটনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেরও রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতি ও জনমতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ফলে এমন একটি সমঝোতা চাওয়া হচ্ছে, যা একদিকে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করবে, অন্যদিকে অঞ্চলকে বড় যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবে।

তবে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দুই দেশের মধ্যে হওয়া অনেক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর ইরানের মধ্যে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ফলে বর্তমান আলোচনাও সহজে সফল হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখন এই আলোচনার দিকে। যদি সমঝোতা সফল হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অনেকটা কমে আসতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সামরিক সংঘাত বিস্তৃত হলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উভয় পক্ষই আপাতদৃষ্টিতে সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে এখনো বহু জটিলতা রয়ে গেছে। যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top