বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত দুর্নীতির ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের তথাকথিত ‘বালিশ-কাণ্ড’। কয়েক বছর আগে এই ঘটনা প্রথম সামনে এলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। তখন জানা গিয়েছিল, প্রকল্পের আবাসন ভবনের জন্য অস্বাভাবিক উচ্চ দামে বালিশ কেনা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) দপ্তরের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। তদন্তে দেখা গেছে, কোনো কোনো বালিশের দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সিএজির তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়েছিল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা দামে কেনা হয় ৬০টি বালিশ। এছাড়া ২৯ হাজার ৮৪৭ টাকা করে কেনা হয়েছিল ৭২টি বালিশ। এমনকি ২০ হাজার টাকা দরে কেনা হয় ৬৬০টি বালিশও। অথচ বাজারমূল্যের সঙ্গে এসব দামের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।
রূপপুর প্রকল্পটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে এটি জাতীয় উন্নয়নের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ শুরু থেকেই ছিল। বিশেষ করে ‘গ্রিন সিটি’ নামে পরিচিত আবাসন প্রকল্পে আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী কেনাকাটায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের খবর জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই ৪ হাজার ৭০২টি বালিশের প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কিন্তু সেগুলো কেনা হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। অর্থাৎ শুধু বালিশ কেনার ক্ষেত্রেই সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত দামে কেনাকাটার মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্র সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
ঘটনাটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৯ সালে। তখন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিটি বালিশ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা দরে কেনা হয়েছে। সেই সময় এই তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছিল যে, একটি সাধারণ বালিশের দাম কীভাবে কয়েক হাজার টাকা হতে পারে? সেই থেকেই ‘বালিশ-কাণ্ড’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে সাম্প্রতিক তদন্তে জানা গেছে, বাস্তবে কিছু বালিশের দাম ছিল আরও কয়েক গুণ বেশি। তদন্তে বলা হয়, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বালিশ, কাভার, পরিবহন ও বিভিন্ন তলায় মালামাল পৌঁছানোর খরচ দেখিয়ে প্রতিটি বালিশের জন্য ৯ হাজার ৩০৭ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অথচ প্রকৃত খরচ ছিল মাত্র ৩ হাজার ১৫৪ টাকা। অর্থাৎ শুরু থেকেই খরচ বাড়িয়ে দেখানোর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সিএজির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজশে এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান বালিশসহ বিভিন্ন আসবাব অতিরিক্ত দামে সরবরাহ করে প্রায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। নিরীক্ষার সময় এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তারা সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি।
এই ঘটনা আবার নতুন করে আলোচনায় আসে যখন সাম্প্রতিক সময় প্রধানমন্ত্রী কাছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেই প্রতিবেদনের মধ্যেই ছিল রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ড’ সম্পর্কিত দুর্নীতির বিশদ তথ্য। প্রধা্নমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী সাংবাদিকদের বলেন, এত বেশি দামে কেনা বালিশের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের বালিশ জাদুঘরে রাখা উচিত।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, রূপপুরের এই ঘটনা শুধু একটি প্রকল্পে অনিয়মের উদাহরণ নয়; এটি বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা ও জবাবদিহির দুর্বলতার প্রতিফলন। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঠিকাদার-কর্মকর্তাদের যোগসাজশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারদামের কয়েক গুণ বেশি ব্যয় দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্ত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রূপপুর প্রকল্পে যে “সাগর চুরি” হয়েছে, তা বহু আগেই আলোচনায় এসেছিল। এখন যেহেতু নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, আত্মসাৎ করা অর্থও উদ্ধার করতে হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে মন্তব্য করছেন, যেখানে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থের সংকটের কথা বলা হয়, সেখানে একটি বালিশ কেনার পেছনে লাখ টাকার কাছাকাছি ব্যয় দেখানো অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও দুঃখজনক। অনেকেই এটিকে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্নীতি ঠেকাতে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের অর্থ অপচয় ও লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।
সব মিলিয়ে রূপপুরের ‘বালিশ-কাণ্ড’ এখন শুধু একটি দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্বল জবাবদিহি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতার একটি বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন তদন্তে উঠে আসা তথ্য আবারও প্রমাণ করেছে, প্রকল্পের আড়ালে কত বড় আকারে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বাস্তবে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

