এক দশকে দেশে ফিরেছে হাজারের বেশি নারী কর্মীর মরদেহ, কোন দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি?

জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশি নারী কর্মীদের একটি অংশ আর জীবিত দেশে ফিরতে পারছেন না। গত এক দশকে বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬৫ নারী কর্মীর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরেছে। এর মধ্যে ১৭০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত এসব মৃত্যুর ১১২টি ঘটেছে সৌদি আরবে কর্মরত নারীদের। ফলে মোট আত্মহত্যার প্রায় ৬৬ শতাংশের সঙ্গে সৌদি আরবের নাম উঠে এসেছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও অভিবাসন গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ফেরা ১ হাজার ৬৫ নারী কর্মীর মধ্যে সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৪৮৬টি মরদেহ। অর্থাৎ মোট মরদেহের প্রায় ৪৬ শতাংশ এসেছে দেশটি থেকে। এসব মরদেহের ১১২টির মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বছরভিত্তিক হিসাবেও সৌদি আরবে নারী কর্মীদের আত্মহত্যার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৩ সালে বিদেশ থেকে ১০১ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরে। তাঁদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং ১৩ জনই সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালে ৯৫টি মরদেহের মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়; তাঁদের ১২ জন ছিলেন সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে দেশে ফেরে ৮৮ নারী কর্মীর মরদেহ। এর মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যাঁদের ১৩ জনই সৌদি আরবে ছিলেন। চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৭৬ নারী কর্মীর মরদেহ। তাঁদের মধ্যে ১১ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলা হয়েছে এবং ছয়জন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন।

এর আগে ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরেছিল ৭০৫ নারী কর্মীর মরদেহ। তাঁদের মধ্যে ১১০ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ৬৮ জনই ছিলেন সৌদি আরবে কর্মরত। রামরুর গবেষণাতেও নারী কর্মীদের মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ওই ছয় বছরে দেশে ফেরা নারী কর্মীদের মৃত্যুর ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল।

তবে মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বজনদের অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে। বিদেশে মৃত্যুর পর দেশে মরদেহ ফেরত এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন করে ময়নাতদন্ত করা হয় না। ফলে মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা কারণই চূড়ান্ত হিসেবে থেকে যায়। রামরুর গবেষণায় সাক্ষাৎকার নেওয়া ১০০ পরিবারের মধ্যে ১১টি পরিবার মৃত্যুসনদে আত্মহত্যার তথ্য বিশ্বাস করেনি। এসব পরিবার দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের আবেদন করলেও তা করা সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। চলতি বছরের ২৩ জুলাই সৌদি আরবে মারা যান সিলেটের তানজিনা আক্তার। তাঁর মৃত্যুসনদে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হলেও পরিবারের বক্তব্য, মৃত্যুর আগের রাতে তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা হয়েছিল। পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, তিনি স্ট্রোক করে মারা গেছেন। পরে মৃত্যুসনদে আত্মহত্যার তথ্য দেখে স্বজনরা বিস্মিত হন।

চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে মারা যান বরিশালের সুচন্দা হালদার। তাঁর মৃত্যুসনদেও আত্মহত্যার কথা বলা হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগের দিন তিনি ফোনে কান্নাকাটি করেছিলেন। দেশে মরদেহ আসার পর কফিন খুলে তাঁর গলা ও ঘাড়ে রক্তের দাগ দেখতে পান স্বজনরা। এতে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তাঁদের সন্দেহ তৈরি হয়।

অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে নারী কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া অনেক নারী নিয়োগকর্তার বাড়িতে অতিরিক্ত কাজ, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। এসব পরিস্থিতি তাঁদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে বিদেশে সন্দেহজনক মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত এবং দেশে মরদেহ ফেরার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দূতাবাস ও লেবার উইংয়ের মাধ্যমে তদন্ত, নির্যাতনের শিকার নারী কর্মীদের দ্রুত উদ্ধার এবং দায়ী নিয়োগকর্তা বা রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশি নারী কর্মীদের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও লেবানন রয়েছে। তবে নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব ও নির্যাতনের অভিযোগের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রার সংখ্যাও কমেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top