জন্মনিবন্ধন সনদ একজন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। কিন্তু সেই সনদেই কারও নাম লেখা হচ্ছে অর্থহীন অক্ষরের সমষ্টি, কোথাও আবার নামের জায়গায় বসছে এমন শব্দ, যার সঙ্গে ব্যক্তির প্রকৃত নামের কোনো মিল নেই। নিবন্ধন কার্যালয়ের এমন ভুলের কারণে সংশোধনের জন্য এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছুটতে হচ্ছে নাগরিকদের। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নানা দাপ্তরিক জটিলতা।
রাজধানীর একটি স্কুলের কানিজ ফাতেমার ১১ বছর বয়সী পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে এবার বৃত্তি পরীক্ষা দেবে। স্কুল থেকে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় জন্মনিবন্ধন সনদ চাওয়া হলে ওয়েবসাইটে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ছেলের বাংলা নাম অস্বাভাবিক কিছু অক্ষরে লেখা হয়েছে। তাঁর স্বামীর নামেও একই ধরনের ভুল দেখা যায়। ২০১৫ সালে ছেলের জন্মসনদ নেওয়ার সময় তিনি শুধু ইংরেজি ভাষার সনদ নিয়েছিলেন।
এমন আরও কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে জন্মসনদ সংশোধনের জন্য আসা এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাঁর মায়ের নামের জায়গায় ভিন্ন একটি শব্দ লেখা পাওয়া যায়। আরেকজনের বড় মেয়ের জন্মসনদে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামের জায়গায় ইংরেজি অক্ষরের একটি অর্থহীন বিন্যাস দেখা গেছে। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, তাঁরা এসব ভুল করেননি; নিবন্ধনের সময়ই ভুলগুলো হয়েছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন হয়েছে। একই সময়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে। এ সময়ে মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি। গত বছর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার।
নাম ও ঠিকানার ভুল সংশোধনের জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে এ বাবদ নাগরিকেরা প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা দিয়েছেন। গত বছর এই খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। এর বাইরে কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদন করলে অতিরিক্ত অর্থও দিতে হয়।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরোনো সময়ে কেউ শুধু বাংলা অথবা শুধু ইংরেজি ভাষায় সনদের আবেদন করলে অন্য ভাষার ঘরে অনেক সময় ভুল বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য টাইপ করা হতো। ফলে এক ভাষার সনদ ঠিক থাকলেও অন্য ভাষায় নাম-ঠিকানা ভুল হয়ে যেত। ২০২৩ সাল থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় একসঙ্গে জন্মসনদ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হওয়ায় একটি ভাষায় ভুল থাকলেও পুরো সনদ সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে।
সংশোধনের প্রক্রিয়াটিও ভোগান্তির। ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর কার্যালয় বা অঞ্চল কার্যালয়ে আবেদন জমা দিতে হয়। সেখান থেকে তা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের অনুমোদনের জন্য যায়। অনুমোদনের পর আবার স্থানীয় কার্যালয়ে ফিরে আসে। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হলেও নাগরিককে একাধিক দপ্তরে যেতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার ক্ষেত্রেও ইউপি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও আবার ইউপিতে যোগাযোগ করতে হয়।
এই ভুলের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। একটি স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, তাঁদের সন্তানদের জন্মসনদেও বাংলা নামের জায়গায় অস্বাভাবিক শব্দ বা চিহ্ন এসেছে। বৃত্তি পরীক্ষার প্রয়োজনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কুল আপাতত ইংরেজি জন্মসনদ গ্রহণ করেছে এবং পরে বাংলা সনদ জমা দিতে বলেছে। ফলে সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকেরা।
রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেছেন, আগের ভুলগুলো কয়েক বছর ধরে সংশোধন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, জন্মসনদ একটি আন্তর্জাতিক নথি এবং এর আধুনিকীকরণ ও ভিসা জালিয়াতি প্রতিরোধের লক্ষ্যেই ২০২৩ সাল থেকে বাংলা-ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং নিজের বা সন্তানের জন্মনিবন্ধনের আবেদন নিজে করার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞ এ বি এম জুবায়েরের মতে, জন্মনিবন্ধনের ভুলের কারণে নাগরিকদের ওপর যে সংশোধনের চাপ পড়ছে, তা কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তিনি জন্মের পরপরই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিবন্ধনের ব্যবস্থা জোরদার করার এবং প্রয়োজন হলে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতেই ৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। কিন্তু নিবন্ধনের ভুল যদি নাগরিকের করা না হয়, সেই ভুল সংশোধনের পুরো দায়ও কেন নাগরিককেই বহন করতে হবে?

