বিদ্যালয়ের সভায় শিক্ষিকাকে থাপ্পড় আরেক শিক্ষকের

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্টাফ সভায় সহকারী শিক্ষিকাকে থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী ও একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. খুরশেদ আলমের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রায় ২০ দিন পর এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে ঘটনার অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এবং বিভাগীয় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

ঘটনাটি গত ১৫ সেপ্টেম্বর উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটে। সেদিন বিদ্যালয়ে স্টাফ সভা চলছিল। সভার শুরুতে উপস্থিতির স্বাক্ষর ও আলোচনার বিষয় নিয়ে প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম এবং সহকারী শিক্ষক খুরশেদ আলমের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এ সময় খুরশেদ আলমের স্ত্রী এবং একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা তাঁদের থামানোর চেষ্টা করেন। শিক্ষিকা তাঁর স্বামীকে শান্ত হতে বলার পর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে উত্তেজিত আচরণ করেন। পরে তাঁকে থাপ্পড় মারার ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও ৬ অক্টোবর বিকেলে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের।

ভিডিওতে বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে প্রধান শিক্ষক ও খুরশেদ আলমকে উত্তপ্তভাবে কথা বলতে দেখা যায়। একপর্যায়ে পাশে থাকা শিক্ষিকা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তখন খুরশেদ আলম তাঁকে হুমকিসূচক কথা বলেন এবং পরে থাপ্পড় মারেন। এরপর তাঁকে সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন বলে ভিডিওতে দেখা ও শোনা যায়।

ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। ২০ সেপ্টেম্বর করা ওই অভিযোগের পর উপজেলা শিক্ষা বিভাগ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা শীতেষ চন্দ্র পালকে কমিটির প্রধান করা হয়। তদন্ত শেষে ৫ অক্টোবর কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় জানিয়েছে।

কলমাকান্দা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেন খান বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে অভিযুক্ত শিক্ষক খুরশেদ আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল আজম জানিয়েছেন, কর্মস্থলে একজন শিক্ষক অন্য শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে পারেন না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থাকলেও বিদ্যালয়ের মতো কর্মস্থলে এ ধরনের আচরণ চাকরিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তদন্তের পাশাপাশি লিখিত অভিযোগে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে কেন্দ্র করে আরও কিছু অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, শিক্ষিকাকে থাপ্পড় মারার ঘটনার প্রতিবাদ করায় খুরশেদ আলম প্রধান শিক্ষকের ওপরও ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তাঁকে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এর আগেও বিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের সঙ্গে তিনি অসদাচরণ করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে কী সিদ্ধান্ত এসেছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানাননি।

এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক খুরশেদ আলম ঘটনার জন্য অনুতপ্ত বলে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার সময় তিনি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী বর্তমানে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন। খুরশেদ আলম ওই বিদ্যালয়ে প্রায় আট বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন এবং তাঁর স্ত্রী প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেখানে কর্মরত বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষিকার বক্তব্য জানতে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে অভিযোগ ও ঘটনার বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর। তবে ভিডিও প্রকাশের আগেই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বিভাগে লিখিত অভিযোগ এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর এখন প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলে চাকরিবিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের কর্মপরিবেশ ও শিক্ষকদের পারস্পরিক আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিভাগীয় ব্যবস্থা কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে। বর্তমানে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার ভিত্তিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top