যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি হলো ডাইভারসিটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা (ডিভি) প্রোগ্রাম। এটি সাধারণভাবে ‘গ্রিন কার্ড লটারি’ বা ‘ডিভি লটারি’ নামে পরিচিত। প্রতিবছর এ কর্মসূচির মাধ্যমে নির্দিষ্টসংখ্যক বিদেশি নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য অভিবাসী ভিসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এ কর্মসূচিতে আবেদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশ থেকে গত পাঁচ বছরে তুলনামূলক বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেছেন, সেসব দেশের অধিবাসীরা ডিভি লটারিতে অংশ নিতে পারেন না। ২০২৬ সালের ডিভি কর্মসূচিতে বাংলাদেশ এই অযোগ্য দেশের তালিকায় ছিল। ফলে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা ওই কর্মসূচিতে সরাসরি আবেদন করতে পারেননি।
তবে দেশভিত্তিক যোগ্যতার ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। কোনো আবেদনকারীর স্বামী বা স্ত্রী যদি যোগ্য কোনো দেশে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তাহলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাঁর জন্মদেশের ভিত্তিতে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। একইভাবে বাবা-মায়ের জন্মদেশের ভিত্তিতেও কিছু ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
ডিভি লটারিতে আবেদনের যোগ্যতা
ডিভি কর্মসূচিতে অংশ নিতে সাধারণত দুটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, আবেদনকারীকে কর্মসূচির জন্য যোগ্য কোনো দেশের অধিবাসী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁকে শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা নির্ধারিত কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সমমানের শিক্ষা সম্পন্ন থাকতে হবে। অর্থাৎ সাধারণত ১২ বছরের আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার প্রমাণ থাকতে হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলে বিকল্প হিসেবে গত পাঁচ বছরের মধ্যে এমন কোনো পেশায় অন্তত দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যেখানে কাজটি সম্পাদনের জন্য কমপক্ষে দুই বছরের প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। সব ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
কীভাবে অনলাইনে আবেদন করবেন?
ডিভি লটারির আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্ধারিত ওয়েবসাইট হলো https://dvprogram.state.gov। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নেওয়া জরুরি।
আবেদনের সাধারণ ধাপগুলো হলো—
১. যোগ্যতা যাচাই: প্রথমে সংশ্লিষ্ট বছরের দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা দেখতে হবে। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী কেউ সরাসরি আবেদন করতে পারবেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. অনলাইন ফরম পূরণ: নির্ধারিত সময়ে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। এতে আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়।
৩. ছবি জমা: আবেদনকারীর সাম্প্রতিক নির্ধারিত মানের ছবি জমা দিতে হয়। বিবাহিত হলে স্বামী বা স্ত্রীর এবং যোগ্য সন্তানদের ছবিও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী দিতে হবে।
৪. পাসপোর্টের তথ্য: নতুন নিয়ম অনুযায়ী ডিভি-২০২৭ থেকে বৈধ ও মেয়াদ থাকা পাসপোর্টের তথ্য এবং পাসপোর্টের জীবনীসংক্রান্ত ও স্বাক্ষরযুক্ত পাতার স্ক্যান জমা দেওয়ার বিধান যুক্ত হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
৫. আবেদন জমা ও কনফার্মেশন নম্বর সংরক্ষণ: সব তথ্য যাচাই করে আবেদন জমা দিতে হবে। সফলভাবে আবেদন সম্পন্ন হলে একটি কনফার্মেশন নম্বর পাওয়া যাবে। ফলাফল দেখার জন্য এই নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদন করতে কত টাকা লাগে?
ডিভি-২০২৬ কর্মসূচিতে আবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো নিবন্ধন ফি ছিল না। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নতুন নিয়ম করে, যার আওতায় ডিভি-২০২৭ থেকে প্রতিটি আবেদনের জন্য ১ ডলার নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচিত হওয়ার পর ভিসা প্রক্রিয়ায় আলাদা ফি দিতে হয়।
লটারির ফলাফল কীভাবে দেখবেন?
আবেদন জমা দেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে সরকারি ওয়েবসাইটের Entrant Status Check অপশনে গিয়ে কনফার্মেশন নম্বর, নাম ও জন্মসাল ব্যবহার করে ফলাফল দেখা যায়। নির্বাচিত হয়েছেন কি না, তা জানার একমাত্র সরকারি পদ্ধতি এটি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সাধারণত নির্বাচিত ব্যক্তিদের ইমেইল বা চিঠি পাঠিয়ে বিজয়ী হওয়ার খবর জানায় না।
তবে লটারিতে নির্বাচিত হওয়া মানেই ভিসা পাওয়া নিশ্চিত নয়। নির্বাচিত ব্যক্তিকে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ এবং সাক্ষাৎকারসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। সব যাচাই শেষে যোগ্য বিবেচিত হলেই ভিসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশিদের জন্য এখন কী অবস্থা?
৩১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা ডিভি-২০২৬ কর্মসূচির। সেখানে বাংলাদেশকে অযোগ্য দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ডিভি-২০২৭ কর্মসূচির নিবন্ধন নিয়ে বিলম্বের পর যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত ১ নভেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নিবন্ধন শুরুর নির্দেশ দিয়েছে। তবে নতুন কর্মসূচির চূড়ান্ত নির্দেশনা ও দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশিদের আবেদনযোগ্যতা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তাই বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আগ্রহীদের আবেদন করার আগে নতুন নির্দেশনায় দেশের নাম যাচাই করতে হবে। কোনো এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠান টাকা নিয়ে লটারি জেতার নিশ্চয়তা দিলে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ডিভি লটারিতে নির্বাচনের বিষয়টি কম্পিউটারের মাধ্যমে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়; অর্থের বিনিময়ে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোর কোনো বৈধ পদ্ধতি নেই।

