দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চাকরি ফিরে পাচ্ছেন আলোচিত সাবেক উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। চাকরিচ্যুতির আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল থাকায় তাঁর চাকরিতে ফেরার পথ খুলেছে। দুদকের করা লিভ টু আপিল প্রত্যাহারের আবেদন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত মঞ্জুর করায় এখন তাঁকে পুনর্বহালে আর কোনো আইনি বাধা নেই। জ্যেষ্ঠতা ও চাকরিচ্যুতির সময় থেকে বকেয়া সুযোগ-সুবিধাসহ তাঁকে চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
শরীফ উদ্দিন ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের উপসহকারী পরিচালক পদ থেকে অপসারিত হন। তখন তিনি পটুয়াখালীতে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তাঁর চাকরিচ্যুতির আদেশে দুদক কর্মচারী বিধিমালা, ২০০৮-এর ৫৪(২) বিধি প্রয়োগ করা হয়। ওই বিধি অনুযায়ী তাঁকে ৯০ দিনের বেতন ও প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে চাকরি থেকে অপসারণের আগে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে তাঁর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতি সে সময় দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। কারণ, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কয়েকটি বড় দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে আলোচনায় এসেছিলেন। বিশেষ করে কক্সবাজারে সরকারি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নিয়োগ, পদোন্নতি ও গ্যাস সংযোগে অনিয়ম এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করেছিলেন তিনি। এসব ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে।
শরীফ উদ্দিনকে অপসারণের পর দুদকের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, শরীফ তদন্তের নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করতেন না এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি নির্দিষ্ট অভিযোগও তুলে ধরে কমিশন।
দুদকের অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার আগেই তিনি লিখিতভাবে ২৫টি ব্যাংক হিসাব এবং মৌখিকভাবে আরও ছয়টি হিসাব বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৯৪ লাখ টাকা দীর্ঘদিন নিজের হেফাজতে রাখার অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কমিশনের দাবি ছিল, জব্দ করা অর্থ যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়নি।
এ ছাড়া বদলির পর তদন্তসংক্রান্ত নথিপত্র কমিশনের কাছে হস্তান্তর করতে দেরি করার অভিযোগও ওঠে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন শরীফ উদ্দিন। ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবগুলো থেকে অর্থ সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকায় আদালতের আদেশ আসার আগেই লেনদেন স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছিলেন। পরে কমিশন ও হাইকোর্টের অনুমতিও পাওয়া যায়।
৯৪ লাখ টাকা সংরক্ষণের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা অর্থ চট্টগ্রাম দুদক কার্যালয়ের ভল্টে রাখা হয়েছিল। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় এবং মামলার বিচারে জব্দ করা অর্থ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়োজন বিবেচনায় তিনি এ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন বলে জানান।
নথিপত্র হস্তান্তরে বিলম্বের বিষয়ে শরীফ উদ্দিন বলেন, বদলির সময় তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর দাবি, মোট ১৩০টি নথি বুঝিয়ে দিতে পাঁচ দিন সময় লেগেছিল। অন্যদিকে, তিনি জানান, তাঁর কাজের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা ছিল এবং তদন্তের অগ্রগতি কমিশনকে জানানো হতো।
দুদকের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে চাকরির প্রথম ছয় বছরে তাঁকে একজন দক্ষ ও ভালো কর্মকর্তা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল বলে শরীফ উদ্দিন উল্লেখ করেছিলেন।
চাকরিচ্যুতির পর শরীফ উদ্দিন ২০২২ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টে রিট করেন। বিনা কারণ দর্শানোর সুযোগে চাকরি থেকে অপসারণের ক্ষেত্রে দুদক কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) বিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন জানান তিনি।
তবে একই বিধিতে দুদকের আরেক কর্মকর্তা মো. আহসান আলীর চাকরিচ্যুতির বিষয়টি আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকায় শরীফের রিটের শুনানি কিছু সময়ের জন্য মুলতবি ছিল। ২০২৩ সালের মার্চে আপিল বিভাগ ওই বিধি বাতিলের বিরুদ্ধে দুদকের আপিল মঞ্জুর করেন। পরে পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিধিটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং ১২টি নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলা হয়।
এরপর শরীফ উদ্দিনের রিটের শুনানি আবার শুরু হয়। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই আদালত তাঁর চাকরিচ্যুতির আদেশকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির অপসারণের আদেশ শুরু থেকেই বাতিল ঘোষণা করে তাঁকে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপিল বিভাগের অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল করে। তবে পরবর্তী সময়ে সংস্থাটি সেই আবেদন আর পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত দুদকের প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করেন। ফলে হাইকোর্টের পুনর্বহালের রায় বহাল থাকে।
শরীফ উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন ২৯ অক্টোবর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আপিল প্রত্যাহার হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সুযোগ-সুবিধাসহ তাঁকে চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা নেই।

