রিকশা ভাড়া পরিশোধ, চায়ের দোকানে বিল দেওয়া কিংবা ছোট অঙ্কের টাকা অন্যের কাছে পাঠানো, দৈনন্দিন এসব লেনদেন আরও সহজ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বজনীন পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’-এর মাধ্যমে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) ডিজিটাল লেনদেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য অনুমোদিত পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ আরও বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের লক্ষ্য নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং সাধারণ মানুষের কাছে ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজলভ্য করা।
নতুন ব্যবস্থায় গ্রাহকেরা নিজেদের ব্যক্তিগত কিউআর কোড তৈরি করতে পারবেন। অন্য ব্যক্তি সেই কোড স্ক্যান করে অথবা কোডের ছবি অ্যাপে আপলোড করে টাকা পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত মার্চেন্ট কিউআর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে না; ব্যক্তিগত পর্যায়েও লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে।
এই সুবিধা চালু হলে রিকশাচালক, বাসের কন্ডাক্টর, হকার, সবজি বিক্রেতা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সেবাদাতারাও ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা গ্রহণ করতে পারবেন। একইভাবে পরিচিতজনকে টাকা পাঠানো কিংবা ছোট অঙ্কের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাটি কাজে আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট সেবাদাতাদের অ্যাপে প্রয়োজনীয় সুবিধা যুক্ত করার কথা রয়েছে। পরদিন ১ নভেম্বর থেকে আন্তপ্রতিষ্ঠান পিটুপি লেনদেন চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিনের কেনাকাটা ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে খুচরা টাকার প্রয়োজন হয়। রিকশা বা বাসের ভাড়া পরিশোধ, ফুটপাতের দোকান থেকে পণ্য কেনা কিংবা অল্প টাকার সেবা গ্রহণের সময় অনেককে ভাংতি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ সরাসরি পাঠানো গেলে এ ধরনের বিড়ম্বনা কমতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো যাত্রীর রিকশাভাড়া ৪৭ টাকা হলে কিউআর কোড ব্যবহার করে ঠিক ওই পরিমাণ অর্থই পাঠানো সম্ভব হবে। এতে ভাংতি ফেরত নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে ছেঁড়া বা নষ্ট নোট নিয়ে লেনদেনের সমস্যাও এড়ানো যেতে পারে।
এ ছাড়া ছোট অঙ্কের অর্থ সহায়তা বা দান করার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত কিউআর কোড ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপযুক্ত অ্যাকাউন্ট ও প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা থাকতে হবে।
বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক লেনদেনের খরচ কমানো এবং অর্থ দ্রুত প্রাপকের হিসাবে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে মার্চেন্টদের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যূনতম ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) তুলে দেওয়া এবং ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের ফলে ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের খরচ কমার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সব ধরনের গ্রাহক ও প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে মাশুল শূন্য হবে এমন নয়। সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও প্রযোজ্য শর্তও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। জুনে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে দৈনিক প্রায় ১৪৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশে প্রায় ৩৯ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। টাকা পাঠানোর আগে কিউআর কোড স্ক্যান করে অ্যাপে প্রদর্শিত প্রাপকের নাম যাচাই করা উচিত। লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রেরক ও প্রাপক, উভয়েরই নিজ নিজ অ্যাপের তথ্য বা নিশ্চিতকরণ বার্তা দেখে অর্থ স্থানান্তর নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার তখনই কার্যকর হবে, যখন শহরের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষও এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। সহজ ব্যবহার, সেবার প্রাপ্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলা কিউআর ক্ষুদ্র লেনদেনকে আরও গতিশীল করতে পারে।

