পেটে গজ রেখে সেলাই, ৫ মাস পর প্রসূতির মৃত্যু

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই দেওয়ার অভিযোগ ওঠার প্রায় পাঁচ মাস পর বিথি আক্তার নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে তাঁর পরিবারের সঙ্গে ৫৫ হাজার টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসার একটি চুক্তি হয়েছিল বলে জানা গেছে।

নিহত বিথি আক্তার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবেও কাজ করতেন।

গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিথির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু দায়িত্বে ছিলেন। ওই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন বিথি। তবে অভিযোগ ওঠে, অস্ত্রোপচারের পর তাঁর পেটের ভেতরে গজ রেখেই সেলাই করা হয়েছিল।

এরপর বিথির শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। তিনি অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের কাছে গেলেও গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

প্রায় দেড় মাস পর দুটি বেসরকারি হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম করালে তাঁর পেটের ভেতরে গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে গত ১২ জুলাই তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। ১৫ জুলাই দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর পেট থেকে গজ বের করা হয়। এ অস্ত্রোপচারে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা অংশ নেন।

দীর্ঘদিন পেটের ভেতরে গজ থাকায় বিথির নাড়িতে পচন ধরে এবং সংক্রমণ দেখা দেয়। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর বিষয়টি প্রথম অস্ত্রোপচারে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে জানানো হয়। ওই রাতেই পরিবারের সঙ্গে আপস-মীমাংসা হয় বলে জানা গেছে। পরে ২২ জুলাই বিথিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি স্থায়ী হয়নি। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি আবার ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে ৪ অক্টোবর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

৫৫ হাজার টাকার আপসের নথি

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি চুক্তিপত্র নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা ওই নথিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া বা আর্থিক দাবি না করার বিষয়টিও চুক্তিতে লেখা রয়েছে। নথিতে বিথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে।

রাকিবুল ইসলাম আপস-মীমাংসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিথি ওই হাসপাতালেই প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন এবং ভবিষ্যতেও সেখানে ইন্টার্নশিপসহ চাকরি করার সম্ভাবনা ছিল। পাশাপাশি সে সময় তাঁর আর্থিক সংকটও ছিল। এসব বিবেচনায় স্ত্রীর চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি মীমাংসায় রাজি হয়েছিলেন। তবে তখন তিনি জানতেন না যে তাঁর স্ত্রী শেষ পর্যন্ত মারা যাবেন। বর্তমানে তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি জটিলতা এড়িয়ে ব্যবস্থা নিতে চান বলে জানিয়েছেন।

তদন্ত কমিটি গঠন

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অর্থ দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নথিটি ছড়িয়ে পড়ার কথা তিনি শুনেছেন।

তিনি আরও জানান, বিথির চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

বিথির চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান স্বপন কুমার বিশ্বাসকে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top