“স্যার, ও এমন চোর খালি ধরা পড়ে, জরিমানা দিতে দিতে আমার সব শেষ”

রংপুরের বদরগঞ্জে মাদকাসক্ত কিশোর ছেলের চুরি ও নেশার অভ্যাসে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তার বাবা-মা। দীর্ঘদিন ধরে ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করেও সফল হননি তাঁরা। বরং একের পর এক চুরির অভিযোগে গ্রাম্য বিচার-সালিসে জরিমানা দিতে গিয়ে পরিবারের শেষ সম্বলও হারিয়েছেন। এবার ছেলেকে নিয়ে তাঁদের আকুতি শুনে তাকে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার দুপুরে বদরগঞ্জ থানায় ওই কিশোর, তার মা-বাবা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকারের মধ্যে কথা হয়। সেখানে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা। তাঁর অনুরোধ, ছেলেকে যেন কোনোভাবে এই জীবন থেকে ফিরিয়ে আনা হয়।

১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরের বিরুদ্ধে এলাকায় প্রায়ই চুরির অভিযোগ ওঠে। এবার বদরগঞ্জ হাটের হক সাহেবের মোড়ের কাছে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চুরি করতে গিয়ে সে ধরা পড়ে।

রিকশার মালিক সমছের আলী রিকশাটি রেখে চা পান করছিলেন। এ সময় চাবি লাগানো রিকশাটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ওই কিশোর। সমছের আলী তাকে ধরে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হন। পরে তাঁরা কিশোরটিকে মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

ছেলের আটকের খবর পেয়ে থানায় ছুটে আসেন তার বাবা। তিনি জানান, খবর পাওয়ার সময় ভাড়ায় গরু পরিবহনের জন্য একটি ভটভটিতে গরু তুলছিলেন। ছেলের বিপদের কথা শুনে সব ফেলে সেখানে যান। কিন্তু লোকজনের মারধরের দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে প্রথমে নিজের পরিচয়ও দেননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, পরিচয় জানালে তাঁকেও মারধর করা হতে পারে।

ওই কিশোরের বাবা জানান, তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে ফেনীতে একটি বেসরকারি কারখানায় কাজ করেন। ছোট ছেলে পরিবারের সঙ্গে গ্রামে থাকত এবং মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। একসময় ছেলেটি ভালো ছিল। কিন্তু গ্রামের মাদকাসক্ত তরুণদের সঙ্গে মিশে প্রায় দুই বছর আগে তার আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

বাবার অভিযোগ, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর ছেলে বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে নেশা করত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে চুরির অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় গ্রামে বিচার-সালিস বসত এবং জরিমানা দিতে হতো পরিবারকে।

ছেলেকে রক্ষা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দুটি গরু ও দুটি ছাগল বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানান বাবা। এখন বিক্রি করার মতো আর কোনো সম্পদ তাঁদের নেই। বারবার জরিমানা দিয়েও ছেলের অভ্যাস বদলাতে না পারায় তিনি চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন।

বাবার দাবি, তাঁদের গ্রামে ১৫ থেকে ২০ জন ছেলে মাদকাসক্ত। তাঁদের সঙ্গে মেলামেশার কারণেই তাঁর ছেলেও নেশায় জড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই রকম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তার মা। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ছেলেকে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই বলে জানান তিনি। ছেলেকে আগের জীবনে ফিরিয়ে দিতে পুলিশের কাছে সাহায্য চান এই মা।

দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও ছেলেকে মাদক থেকে দূরে রাখতে না পারা, বারবার চুরির অভিযোগ এবং পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে জরিমানা দেওয়া, সব মিলিয়ে দম্পতি এখন দিশাহারা। তাঁদের চাওয়া, ছেলে যেন চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হয় এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।

মা-বাবার অসহায়ত্বের কথা শুনে কিশোরটিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার। তিনি তাকে রংপুর নগরের আইডিয়াল মোড় এলাকার সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠান। সেখানে বিনা মূল্যে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

ওসি জানান, চুরির অভিযোগ থাকলেও কিশোরটির বয়স বিবেচনায় নিয়ে শিশু আইনের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানোর উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ওই এলাকার মাদক কারবারিদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top