২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের তৃতীয় দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূইয়ার প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় এই লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে বিষয়টিকে কেবল জিডিপির আকার বাড়ানোর লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের সমন্বিত রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনে সরকার তিন ধাপের ‘থ্রি-আর’ নীতি গ্রহণ করেছে। প্রথম ধাপ ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’—এক বছর মেয়াদি এ ধাপের লক্ষ্য অর্থনীতির অবনতির ধারা রোধ করে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় ধাপ ‘রিস্টোরেশন’-এর আওতায় সরকারের প্রথম তিন বছরে রাজস্ব ব্যবস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ, কৃষি, জ্বালানি ও অবকাঠামোর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও সম্প্রসারণ করা হবে। তৃতীয় ধাপ ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন’-এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর, উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন ও বৈশ্বিক সংযোগ সম্প্রসারণ করা হবে।
কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ ও ব্যবসা সহজীকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক অনুমোদনের জন্য ‘বেঙ্গলবিজ’ নামে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে এবং ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রকাশ করা হয়েছে এফডিআই হিট ম্যাপ। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার, করপোরেট বন্ড ও বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন অর্থায়নে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি সহনীয় রাখা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা, ‘ভ্যালু ফর মানি’ ও ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনাকে সরকারি বিনিয়োগের মূল নীতি হিসেবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল অর্থনীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে একই রূপান্তর কৌশলের অংশ করা হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড-চেইন, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও লজিস্টিকস উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।’
সরকারের সামগ্রিক কৌশল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, এরপর বিনিয়োগ ও উৎপাদনের দ্রুত সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধি, আর্থিক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতানির্ভর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই লক্ষ্য।
কওমি মাদরাসার জন্য ৬ শিক্ষা বোর্ড
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের সব কওমি মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ২০০৬ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ‘কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করে ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বোর্ডগুলো হলো—বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ, তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ এবং জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, গত ২৩ জুন ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬’ সংশোধন করে সহকারী মৌলভী (ক্বারী) ও ইবতেদায়ী ক্বারী পদে নিয়োগের কাম্য যোগ্যতায় এই ছয়টি বোর্ডের সনদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল) ডিগ্রিসহ ইলমে কিরাআত বা হিফজুল কোরআন সনদপ্রাপ্তদের ওই দুটি পদে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

