সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট জনরোষের আতঙ্কে কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসভবন ছাড়তে অনীহা প্রকাশ করছেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় তারা সুরক্ষিত সরকারি আবাসন ছাড়তে চাইছেন না। এর ফলে বর্তমান সরকারের নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য আবাসন সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় চলতি মাসের মধ্যেই বাড়িগুলো খালি করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামল নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে ব্যাপক উদ্বেগ উঠে আসে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, এই সময়ে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত হন। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও সংঘর্ষে ৬০ জন এবং কারাগারে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিও ছিলেন। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিশোধমূলক হামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে ভীত সাবেক উপদেষ্টারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, গণহারে হয়রানিমূলক মামলা, এবং সাবেক অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে। তার মতে, সব উপদেষ্টা সমানভাবে দায়ী না হলেও, সামগ্রিক ব্যর্থতার দায় এখন তাদের ওপর এসে পড়ছে, যা তাদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
এদিকে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সাবেক উপদেষ্টাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য সরকারি আবাসন ব্যবহারের সুযোগ নেই। আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সাবেক উপদেষ্টাদের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের মতো কোনো আবাসন নীতিমালা বা পেনশন সুবিধা নেই। তাই চলতি মাসের মধ্যেই তাদের বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য অবহিত করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে সর্বোচ্চ এক-দুই মাস সময় দেওয়া হলেও, মার্চ মাস থেকে সরকার নির্ধারিত হারে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন সরকারের আবাসন সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকারের প্রায় ৬০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার জন্য আবাসনের প্রয়োজন। কিন্তু মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডে বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট মিলিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার মতো বাড়ি রয়েছে মাত্র ৩৭টি। ইতোমধ্যে ২১ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাসার জন্য আবেদন করেছেন। আবাসন পরিদপ্তর আশা করছে, চলতি মাসে বাসাগুলো খালি হলে দ্রুত মেরামত করে মার্চের মধ্যেই নতুনদের বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে।
জানা গেছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চলতি ফেব্রুয়ারির মধ্যেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ ছেড়ে তার ব্যক্তিগত বাসভবনে উঠবেন। তবে বাকিদের অনীহার কারণে নতুন সরকারের কার্যক্রমের শুরুতেই আবাসন নিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

