মানবিকতার জায়গা থেকে নিজের একটি কিডনি দান করেছিলেন অসুস্থ বসকে বাঁচানোর আশায়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর কর্মক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার ও শেষ পর্যন্ত চাকরি হারানোর অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের এক নারী। ডেবোরা স্টিভেন্স নামের ওই নারী অভিযোগ করেন, বসের জন্য কিডনি দানের পর শারীরিক জটিলতা নিয়ে কাজে ফিরলে তাঁর সঙ্গে আচরণ বদলে যায়। একপর্যায়ে তাঁকে চাকরি থেকেও বাদ দেওয়া হয়। ২০১২ সালে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ডেবোরা স্টিভেন্স নিউইয়র্কের হিকসভিল এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি লং আইল্যান্ডভিত্তিক গাড়ি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক অটোমোটিভ গ্রুপে কাজ করতেন। তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জ্যাকলিন ব্রুসিয়ার কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিলে স্টিভেন্স তাঁকে কিডনি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তখন তিনি সাময়িকভাবে ফ্লোরিডায় অবস্থান করছিলেন।
স্টিভেন্সের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১০ সালের নভেম্বরে তিনি ব্রুসিয়ার কিডনির প্রয়োজনীয়তার কথা জানতে পারেন। প্রাথমিকভাবে তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও পরে ব্রুসিয়া আবার তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি কিডনি দান করতে আগ্রহী কি না। অন্য একজন সম্ভাব্য দাতার অনুমোদন না পাওয়ার পর এই প্রস্তাবটি আবারও দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করেন।
নিজের কিডনি দিয়েও সরাসরি মেলেনি বসের সঙ্গে
চিকিৎসকদের পরীক্ষায় দেখা যায়, স্টিভেন্সের কিডনি ব্রুসিয়ার সঙ্গে উপযুক্তভাবে মেলে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর দান বৃথা যাবে। চিকিৎসকেরা তাঁকে অন্য একজন রোগীকে কিডনি দানের সুযোগ দেন। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত কিডনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া তৈরি হয়।
স্টিভেন্স মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের এক অপরিচিত ব্যক্তিকে নিজের কিডনি দান করেন। এর বিনিময়ে প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকা ব্রুসিয়া সান ফ্রান্সিসকোর এক দাতার কাছ থেকে তাঁর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিডনি পাওয়ার সুযোগ পান। অর্থাৎ, স্টিভেন্স সরাসরি বসকে কিডনি না দিলেও তাঁর দান পুরো প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০১১ সালের আগস্টে স্টিভেন্সের অস্ত্রোপচার হয়। প্রায় এক মাস পর তিনি কাজে ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁর দাবি, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই কর্মক্ষেত্রে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে।
অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক জটিলতার অভিযোগ
স্টিভেন্সের আইনজীবী লেনার্ড লিডসের বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর তাঁর পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি হজমের সমস্যা এবং মানসিক চাপজনিত জটিলতাও দেখা দেয়। এসব সমস্যার কারণে তাঁকে মাঝে মাঝে অসুস্থতাজনিত ছুটি নিতে হতো।
স্টিভেন্স অভিযোগ করেন, ছুটি নেওয়ার কারণে তাঁকে তিরস্কার করা হতো এবং তাঁর সঙ্গে কঠোর আচরণ করা হতো। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে মানবসম্পদ বিভাগে অভিযোগ জানানোর পর তাঁকে তুলনামূলক কম পছন্দের একটি কার্যালয়ে বদলি করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য জানায়, কর্মদক্ষতাসংক্রান্ত কারণেই তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
মানবাধিকার বিভাগে অভিযোগ
চাকরি হারানোর পর স্টিভেন্স নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মানবাধিকার বিভাগে অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, অস্ত্রোপচারের জটিলতার কারণে সৃষ্ট শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য তাঁর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ জানানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তাঁর আইনজীবী জানান, ক্ষতিপূরণ এবং হারানো আয়ের দাবি নিয়ে ফেডারেল আদালতে মামলা করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল।
তবে আটলান্টিক অটোমোটিভ গ্রুপ স্টিভেন্সের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য ছিল, অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং কর্মীর সঙ্গে তারা যথাযথ ও ন্যায়সংগত আচরণ করেছে। ফলে ঘটনাটি নিয়ে একদিকে স্টিভেন্সের বৈষম্য ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের অস্বীকৃতি, দুই ধরনের বক্তব্যই সামনে আসে।

