নিজের বাবাকে ২.৫ লাখ টাকা বেতন দেয় রাউল

ভারতের কেরালার ১৬ বছর বয়সী কিশোর রাউল জন আজু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করে আলোচনায় এসেছেন। দ্বাদশ শ্রেণিতে বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি পরিচালনা করছেন নিজের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিজের বাবাকে মাসে দুই লাখ ভারতীয় রুপি বেতন দেন তিনি। অল্প বয়সে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ, একাধিক এআই টুল তৈরি এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কারণে তাঁকে ‘ভারতের এআই কিড’ বলা হচ্ছে।

রাউল কেরালার কোচির নর্থ এডাপল্লি সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর আগ্রহকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ জন কাজ করেন। এআই বিষয়ে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয় রাউল।

রাউলের গল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হলো, তাঁর বাবা আজু জোসেফ নিজেই ছেলের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এ জন্য তিনি প্রতি মাসে দুই লাখ রুপি বেতন পান। তবে বাবাকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাউল।

আজু জোসেফ অ্যামাজন, অ্যাডোবি, উইপ্রো ও আইবিএমের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। প্রযুক্তি খাতে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে নিজের ব্যবসা পরিচালনা ও বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন রাউল। তাঁর মতে, ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন থেকে অনেক তথ্য শেখা সম্ভব হলেও বাস্তব কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শেখার প্রয়োজন রয়েছে।

রাউলের প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহের শুরু মাত্র নয় বছর বয়সে। প্রথম দিকে ভিডিও সম্পাদনার মতো বিষয় নিয়ে কাজ করতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। বাবার অ্যাডোবিতে চাকরি পাওয়ার পর বিভিন্ন প্রিমিয়াম প্রযুক্তি সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগও তাঁর শেখার আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

স্কুলে বিজ্ঞান প্রকল্পের অংশ হিসেবে ‘মিবট’ (MeBot) নামের একটি রোবট তৈরি করেন রাউল। রোবটটি তাঁর নিজের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারে। স্কুলের একটি প্রকল্প থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর কাজের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ হয়ে ওঠে।

বর্তমানে তাঁর তৈরি করা এআই প্রকল্প ও টুলের সংখ্যা প্রায় ১৫। এর মধ্যে মিবট, রেসকিউ এআই (RESQ AI), জ্যাপগ্যাপ (ZapGap), ইনভেস্টো এআই (Investo AI) ও ফিডফাই (FeedFye) রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করছেন তিনি।

প্রযুক্তিপণ্য তৈরির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে মানুষকে শেখানোর কাজও করছেন রাউল। তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থিংকক্র্যাফট একাডেমির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া জনসাধারণের প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের উদ্যোগও রয়েছে তাঁর কাজের মধ্যে। কেরালা সরকারের সহযোগিতায় তৈরি জাস্টইজ (JustEase) নামের একটি উদ্যোগ জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য পেতে মানুষকে সহায়তা করার লক্ষ্যে কাজ করে। অন্যদিকে, রেসকিউ এআইয়ের মাধ্যমে জরুরি নির্দেশনা, আইনসংক্রান্ত তথ্য ও আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

রাউলের কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি এনে দিয়েছে। ২০২৬ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে অংশ নেন তিনি। সেখানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তরুণদের ভূমিকা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন।

এ ছাড়া চলতি বছর কোচিতে অনুষ্ঠিত মানোরমা নিউজ কনক্লেভেও অংশ নেন রাউল। সেখানে তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার, ইন্টারনেট থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top