বাজারে ডিম কিনতে গেলে অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, লাল ডিম বেশি পুষ্টিকর, নাকি সাদা ডিম? প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, লাল বা বাদামি খোসার ডিমে পুষ্টিগুণ বেশি এবং দামও বেশি হওয়ায় অনেকে সেটিকে বেশি উপকারী মনে করেন। অন্যদিকে সাদা ডিমকে তুলনামূলক কম পুষ্টিকর ভাবেন কেউ কেউ। তবে পুষ্টিবিজ্ঞান ও গবেষণার তথ্য বলছে, শুধু খোসার রং দেখে ডিমের পুষ্টিমান নির্ধারণ করা যায় না। লাল ও সাদা ডিমের পুষ্টিগুণে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডিমের খোসার রং নির্ভর করে ডিম পাড়া মুরগির জাতের ওপর। সাদা খোসার ডিম ও বাদামি খোসার ডিমের পুষ্টিমান সাধারণত প্রায় একই। অর্থাৎ, একটি ডিম লাল বা বাদামি রঙের হলেই সেটিতে বেশি প্রোটিন, ভিটামিন কিংবা খনিজ উপাদান থাকবে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ডিমের খোসার রং কেন আলাদা হয়?
মুরগির বংশগত বৈশিষ্ট্য ও জাতের কারণে ডিমের খোসার রঙে পার্থক্য দেখা যায়। সাধারণত সাদা পালক ও সাদা কানের লতিযুক্ত মুরগি সাদা খোসার ডিম পাড়ে। অন্যদিকে লাল বা বাদামি পালক এবং লাল কানের লতিযুক্ত মুরগি সাধারণত বাদামি খোসার ডিম পাড়ে।
ডিম তৈরি হওয়ার সময় মুরগির প্রজননতন্ত্রে নির্দিষ্ট রঞ্জক পদার্থ জমা হওয়ার কারণে খোসায় রং তৈরি হয়। বাদামি ডিমের ক্ষেত্রে প্রোটোপর্ফাইরিন-৯ নামের রঞ্জক পদার্থ এই রঙের জন্য দায়ী। ফলে খোসার রং মূলত বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, ভেতরের পুষ্টি উপাদানের পরিমাণের সরাসরি নির্দেশক নয়।
ডিমের পুষ্টিগুণ কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?
ডিমের পুষ্টিমান নির্ধারণে খোসার রঙের চেয়ে মুরগির খাবার ও পালনপদ্ধতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মুরগিকে কী ধরনের খাবার দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর ডিমের কিছু পুষ্টি উপাদানের পরিমাণে পরিবর্তন আসতে পারে।
কর্নেল ইউনিভার্সিটির কলেজ অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদামি খোসার ডিমে কিছু ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সামান্য বেশি থাকতে পারে। তবে এই পার্থক্য খুব বেশি নয়। মুরগির খাদ্যাভ্যাস ডিমের পুষ্টি উপাদান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
একইভাবে মুরগির খাবারে ফ্ল্যাক্সসিড বা তিসির মতো ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ উপাদান যোগ করলে ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়তে পারে। নির্দিষ্ট ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার দিলে ডিমের সংশ্লিষ্ট ভিটামিনের পরিমাণও বাড়ানো সম্ভব।
কুসুমের গাঢ় রং কি বেশি পুষ্টির লক্ষণ?
অনেকের ধারণা, ডিমের কুসুম যত বেশি গাঢ় হলুদ বা কমলা হবে, সেটি তত বেশি পুষ্টিকর। কিন্তু কুসুমের রংও সরাসরি ডিমের সামগ্রিক পুষ্টিমান নির্দেশ করে না।
ডিমের কুসুমের রং মূলত মুরগির খাদ্যে থাকা ক্যারোটিনয়েড বা প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থের ওপর নির্ভর করে। ভুট্টা, সবুজ ঘাস, বিভিন্ন উদ্ভিদ ও অন্যান্য রঞ্জকসমৃদ্ধ খাবার মুরগির খাদ্যে থাকলে কুসুমের রং গাঢ় হতে পারে। এমনকি মুরগির খাবারে নির্দিষ্ট উপাদান যোগ করেও কুসুমের রং পরিবর্তন করা সম্ভব।
তাই কুসুমের গাঢ় রং দেখেই সেটিকে বেশি পুষ্টিকর মনে করার সুযোগ নেই। তবে মুরগির খাদ্যাভ্যাসের কারণে কুসুমে কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের তারতম্য হতে পারে।
বেশি দাম মানেই কি বেশি পুষ্টি?
বাজারে অনেক সময় বাদামি বা লাল ডিমের দাম সাদা ডিমের চেয়ে বেশি থাকে। এর একটি কারণ হলো বাদামি ডিম পাড়া মুরগির কিছু জাত আকারে তুলনামূলক বড় এবং তাদের খাবারের চাহিদাও বেশি। ফলে ডিম উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত তথ্যেও বলা হয়েছে, বাদামি ডিম পাড়া মুরগি সাধারণত সাদা ডিম পাড়া মুরগির তুলনায় বেশি খাবার গ্রহণ করে। এ কারণে ঐতিহাসিকভাবে বাদামি ডিমের উৎপাদন খরচ বেশি ছিল।
তবে বেশি দাম দিয়ে ডিম কিনলেই বেশি পুষ্টি পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একই আকারের সাধারণ সাদা ও বাদামি ডিমের পুষ্টিমান প্রায় সমান হতে পারে।
তাহলে কোন ডিম খাওয়া ভালো?
পুষ্টিগুণের বিবেচনায় লাল ও সাদা ডিমের মধ্যে আলাদা করে কোনো একটিকে এগিয়ে রাখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং ডিম কেনার সময় এর সতেজতা, আকার, সংরক্ষণের অবস্থা এবং উৎপাদনপদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন এবং ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা ও পরামর্শেও খোসার রঙের কারণে ডিমের পুষ্টিমান উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় না বলে জানানো হয়েছে।

