খাতা-কলম ছাড়াই পরীক্ষা দিবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

প্রচলিত কাগজ-কলমের পরীক্ষা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিতে চালু হয়েছে ‘পেপারলেস এক্সাম সিস্টেম’। নতুন এই ব্যবস্থায় খাতা-কলম ও ছাপানো প্রশ্নপত্র ছাড়াই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই ফলাফল দেখার সুযোগও থাকছে।

প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইসিই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ওই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থীরা নতুন ব্যবস্থায় একটি টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় অংশ নেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কার্যকারিতা ও সফলতা বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগেও এই পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের পরিচালক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. হাসনাত কবীরের তত্ত্বাবধানে পেপারলেস এক্সাম সিস্টেমটি তৈরি করা হয়েছে। এর নির্মাণে কাজ করেছেন আইসিই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক এবং মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সামিউল বাসির। প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত পরীক্ষাপদ্ধতিকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

নতুন সিস্টেমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের জন্য আলাদা সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তারা তাৎক্ষণিকভাবে ফলাফল দেখতে পারবেন। শুধু ফলাফলই নয়, কোন প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়েছে, সঠিক উত্তর কী এবং তার ব্যাখ্যাও দেখার সুযোগ থাকছে। ফলে পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল শনাক্ত করে তা সংশোধনের সুযোগ পাবেন।

সিস্টেমটিতে রয়েছে সমৃদ্ধ প্রশ্নব্যাংক। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা তুলনামূলক সহজে প্রশ্ন তৈরি করতে এবং একাধিক পরীক্ষা পরিচালনা করতে পারবেন। স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়নের কারণে শিক্ষকদের খাতা দেখার সময় কমবে। একই সঙ্গে দ্রুত ফল প্রকাশ এবং মূল্যায়নে নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও এই পদ্ধতি সুবিধা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরীক্ষার সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ফলাফল সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরির সুবিধা থাকবে। এর ফলে কাগজের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সময়ের অপচয় ও প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার কিছু প্রশাসনিক জটিলতাও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষাপদ্ধতিকে আরও দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও পরিবেশবান্ধব করার সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। আইসিই বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহামুদুল হাসান শান্ত জানান, নির্ধারিত সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষা শুরু ও শেষ হওয়া এবং পরীক্ষা শেষে দ্রুত ফলাফল পাওয়ার বিষয়টি তার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছে। তার মতে, এ ব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই উপকৃত হতে পারেন। পাশাপাশি নকল প্রতিরোধ ও সঠিক মূল্যায়নেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

একই বর্ষের শিক্ষার্থী মনীষা আফরিন তিন্নিও পদ্ধতিটিকে সহায়ক ও কার্যকর বলে উল্লেখ করেছেন। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষে ফলাফল দেখার পাশাপাশি ভুল উত্তর এবং সঠিক উত্তর সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল বুঝতে এবং পরবর্তী সময়ে তা সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছেন। কাগজ ছাড়াই পরীক্ষা দেওয়ার ফলে ব্যবস্থাটি সহজ ও সময়সাশ্রয়ী বলেও তিনি মনে করেন।

পেপারলেস এক্সাম সিস্টেমের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. মো. হাসনাত কবীরের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কাগজনির্ভর পরীক্ষা থেকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কাগজবিহীন পরীক্ষা গ্রহণ, দ্রুত ফল প্রক্রিয়াকরণ, পরীক্ষা শেষে ফলাফল প্রদর্শন এবং ফলাফল প্রক্রিয়ায় নির্ভুলতা বাড়ানো এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে আইসিই বিভাগে ব্যবস্থাটি চালু হলেও ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগে তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও চাইলে এই সিস্টেম ব্যবহার করে পরীক্ষা নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সিস্টেমের নির্মাতারা প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দিতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমকে অটোমেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষাপদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ভোগান্তিমুক্ত করার ধারাবাহিকতায় পেপারলেস পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগকেও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

উপাচার্যের মতে, এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ হয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া। ফলে পরীক্ষার ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top