ধোঁয়া-বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত ইন্দোনেশিয়া, এক মাসে মৃত্যু ৫৩১০

ইন্দোনেশিয়ায় বায়ুদূষণ ও বিষাক্ত বাতাসের প্রভাবে এক মাসের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বায়ুর মানের অবনতি এবং দূষণের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষাক্ত বাতাসের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি মানুষের শ্বাসতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসে অবস্থান করলে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও ফুসফুসজনিত নানা জটিলতার আশঙ্কা থাকে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষেরা এ ধরনের দূষণের কারণে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

হেলসিংকিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দাবানলের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণে আনুমানিক ৩ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, যানবাহন ও বর্জ্য পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট দূষণে আরও প্রায় ১ হাজার ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে এক মাসে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩১০ জনে।

সেপ্টেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ৫ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর থেকে বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে এসেছেন। দেশটির সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও এবং পূর্বাঞ্চলে দূষণের প্রভাব বেশি দেখা গেছে।

বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উপাদান পিএম২.৫। এই অতিসূক্ষ্ম কণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহেও পৌঁছাতে সক্ষম। সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় এই কণার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত বার্ষিক সীমার সাত গুণের বেশি ছিল। সুমাত্রায় তা ১০ গুণ এবং বোর্নিওর কালিমানতান অঞ্চলে ২৪ গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এ ছাড়া দেশটিতে শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণের ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় কয়েক মাস ধরে দাবানল চলার পেছনে খরা ও এল নিনো আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশটিতে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি বন ও ভূমি আগুনে পুড়ে গেছে।

দাবানলের ধোঁয়া দেশের সীমানা পেরিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও পূর্ব তিমুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এসব দেশেও বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে।

রাজধানী জাকার্তাসহ জনবহুল জাভা দ্বীপেও বায়ুদূষণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সিআরইএর হিসাবে, সেপ্টেম্বরে জাভায় বায়ুদূষণজনিত আনুমানিক ১ হাজার ৫৩০টি মৃত্যুর ৭৩ থেকে ৮০ শতাংশের পেছনে ছিল দাবানলবহির্ভূত দূষণ। এর মধ্যে শিল্পকারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানোর বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়া সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে ৭২ হাজারের বেশি মানুষকে নিয়োজিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ২ হাজার ১০০-এর বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন এবং ৫৩ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।

তবে সিআরইএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মৃত্যুর হিসাব ইন্দোনেশিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কিংবা প্রত্যাখ্যান করেনি।

গবেষণা সংস্থাটি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আগুন নেভানোর ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ পিটভূমি পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত এবং শিল্পকারখানা ও যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top