মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এক অভিনব ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ পেতে সাধারণ মানুষ ও তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফাহমিদ আল নাঈম নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বর্তমান সময়ে দেশের ডিজিটাল জালিয়াতি চক্রের অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ এই ফাহমিদ।
সাধারণ মানুষকে রাতারাতি ধনী বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে ফাহমিদ ‘বনিক ড্রপশিপিং’ নামের একটি ভুয়া ই-কমার্স মডেল তৈরি করেন। মাত্র ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগে শতভাগ সফল ব্যবসায়ী হওয়ার টোপ দিয়ে তিনি হাজার হাজার মানুষকে আকৃষ্ট করতেন। তার এই ব্যবসায়িক মডেলে যুক্ত হতে এবং ওয়েবসাইট ব্যবহারের এক্সেস নিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬ মাসের জন্য ১৯,৯৯৯ টাকা এবং ১ বছরের জন্য ২৪,০০০ টাকা ফি নেওয়া হতো। বিশেষ অফারের নামেও চলতো চতুরতার সাথে অর্থ আদায়।
ফাহমিদ বিভিন্ন লাইভ সেশন ও ক্লাসের মাধ্যমে তরুণদের মগজ ধোলাই করতেন। তার মূল বক্তব্য ছিল, নিজের কোনো পুঁজি বা প্রোডাক্ট ছাড়াই অন্যের কোটি কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে লাভবান হওয়া সম্ভব। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা দিয়ে মেম্বারশিপ নেওয়ার পর দেখা যেত সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। রংপুরের ওমর ফারুক ও ভুক্তভোগী মশিউল আজম মামুন জানান, কোটি কোটি টাকার স্টকের কথা বলা হলেও মেম্বারশিপ নেওয়ার পর ওয়েবসাইটের সমস্ত প্রোডাক্ট সব সময়ই ‘স্টক আউট’ দেখাত। মূলত ব্যবসার কোনো বাস্তব ভিত্তিই ছিল না, এটি ছিল শুধুই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি সুনিপুণ স্ক্যাম।
ফাহমিদ নিজেই এক ভিডিও ক্লিপে স্বীকার করেছেন যে, এক সময় তার পরিবারের একটি সাইকেল কিনে দেওয়ার মতো সামর্থ্য বা ক্যাপাসিটি ছিল না। কিন্তু এই অল্প কয়েক বছরেই যেন তার হাতে আলাদিনের চেরাগ চলে আসে। ডিজিটাল প্রতারণার টাকা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
রাজধানী ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে (১৬ নম্বর সেক্টর) বিশাল জমি কিনে তিনি ১০ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন, যা তার মূল প্রতিষ্ঠান ‘স্টেপ আপ’-এর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া চলাচলের জন্য তিনি ব্যবহার করেন কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ‘ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো’ গাড়ি। তার সংগ্রহে রয়েছে দামি ‘বিওয়াইডি’ ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়িও। ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে তার একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও জানা গেছে।
প্রতারণার এই টাকার ছোঁয়া লেগেছে ফাহমিদের গ্রামের বাড়িতেও। তার পৈতৃক নিবাস ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার উত্তর নাওপাড়া গ্রামে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ফাহমিদের পরিবার আগে চরে বসবাস করতো এবং তাদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সাধারণ ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে সেখানে হঠাৎ করেই গড়ে উঠেছে একটি নান্দনিক ও চোখ ধাঁধানো বহুতল প্রাসাদ। শুধু এই বাড়িই নয়, ময়মনসিংহ শহর, মাওনা এবং গফরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় তিনি বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন বলে স্থানীয়রা তথ্য দিয়েছেন।
ফাহমিদের এই প্রতারণার মূল শিকার দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যারা একটু স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় নিজেদের জমানো টাকা তার তহবিলে জমা দিয়েছিলেন। প্রতারণার শিকার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান ও শামীম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের মতো সরল শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে ফাহমিদ নিজে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। এই ধরণের জঘন্য ডিজিটাল জালিয়াত চক্রের প্রধান ফাহমিদ আল নাঈমের দ্রুত গ্রেফতার এবং কঠোরতম আইনানুগ শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে আর কোনো তরুণ এভাবে সর্বস্বান্ত না হয়।

