মানবদেহের গড় তাপমাত্রা আর ৯৮.৬ ডিগ্রি নেই? যা বলছে গবেষণা

একসময় মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বলতে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটকেই বোঝানো হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে এই তাপমাত্রাকে স্বাভাবিকের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত দেড় শতকে মানুষের শরীরের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।

মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন জার্মান চিকিৎসক কার্ল রেইনহোল্ড অগাস্ট উন্ডারলিশ। ১৮৬০-এর দশকে তিনি এ বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা পরিচালনা করেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে ২৫ হাজার রোগীর শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করে তিনি ১০ লাখের বেশি তাপমাত্রার তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস নির্ধারণ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর এই হিসাব চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল স্বীকৃত মানদণ্ড হয়ে ওঠে।

তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের বিষয়টি বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জুলি পারসনেটের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ১৮৬২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা দেখতে পান, মানুষের শরীরের গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের নতুন গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় ৯৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৬ দশমিক ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে উল্লেখ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি দশকে পুরুষদের শরীরের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০ দশমিক ০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং নারীদের ক্ষেত্রে ০ দশমিক ০২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে কমেছে। পুরুষদের শরীরের তাপমাত্রা কমার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, আমাজন অঞ্চলের টসিমানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে তাঁদের গড় শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও ২০১৮ সালে তা কমে প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়ায়।

কেন কমছে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা?

বিজ্ঞানীরা শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি। দেড়শ বছর আগে সংক্রামক রোগ, যক্ষ্মা, আমাশয়, দাঁতের গুরুতর সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রদাহের প্রকোপ বেশি ছিল। এসব রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। এর ফলে শরীরে তাপ উৎপাদনের পরিমাণও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি, টিকাদান কর্মসূচি, উন্নত স্যানিটেশন এবং বিভিন্ন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ফলে মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আমাজনের টসিমানে জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও টিকাদান ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উন্নতির প্রভাব দেখা গেছে। শৌচাগারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জুতা পরার প্রবণতা বাড়ায় পরজীবী কৃমির সংক্রমণও কমেছে।

আধুনিক জীবনযাত্রাও শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বর্তমানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় হিটিংয়ের কারণে মানুষ বেশির ভাগ সময় আরামদায়ক তাপমাত্রার পরিবেশে থাকতে পারে। ফলে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা সামঞ্জস্য রাখতে আগের মতো বাড়তি শক্তি ব্যয় করতে হয় না। এতে শরীরের তাপ উৎপাদনও কমতে পারে।

তবে তাপমাত্রা কমার পেছনে পুরোনো থার্মোমিটারের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উন্ডারলিশের সময় পারদযুক্ত কাচের থার্মোমিটার ব্যবহার করা হতো এবং সাধারণত বগলের নিচে তাপমাত্রা মাপা হতো। বর্তমানে মুখের ভেতরে থার্মোমিটার রেখে তাপমাত্রা মাপার পদ্ধতি বেশি প্রচলিত। পুরোনো ও আধুনিক পরিমাপপদ্ধতির এই পার্থক্যও গবেষণার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তবে জুলি পারসনেটের গবেষণায় বিভিন্ন সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেও তাপমাত্রা কমার প্রবণতা পাওয়া গেছে।

শরীরের তাপমাত্রা কি সবার ক্ষেত্রে এক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের শরীরের তাপমাত্রা বয়স, লিঙ্গ, দিনের সময়, উচ্চতা ও ওজনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপাকীয় কার্যক্রম ধীর হয় এবং শারীরিক সক্রিয়তা কমে আসে। ফলে শরীরের তাপ উৎপাদনও কমতে পারে। নারীদের শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। এ ছাড়া দিনের বিভিন্ন সময়েও তাপমাত্রার পার্থক্য দেখা যায়। ভোরের দিকে শরীরের তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে এবং বিকেলের দিকে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

তবে এসব পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এখন আর স্বাভাবিক নয়। চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সবার জন্য কঠোর স্বাভাবিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। ব্যক্তিভেদে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। এমনকি ৩৬ দশমিক ৯৯ ও ৩৭ দশমিক ০১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে চিকিৎসাগতভাবে বড় কোনো পার্থক্য নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামান্য ওঠানামা মানেই অসুস্থতা নয়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে কিংবা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে তা গুরুতর শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top