মাল্টায় দিতে হচ্ছে টেসলা-মার্সিডিজ থেকেও বেশি শুল্ক-কর

বাংলাদেশে বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় আমদানি করা মাল্টায় বেশি শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে মাল্টা আমদানিতে মোট শুল্ক-করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের ট্যারিফ অনুযায়ী টেসলা ও মার্সিডিজ বেঞ্জসহ অন্তত ১৪৬টি এইচএস কোডভুক্ত গাড়ির আমদানিতে শুল্ক-করহার মাল্টার চেয়ে কম।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি টেসলা আমদানি হয়েছে সাতটি। বছরভেদে এসব গাড়িতে ৮৯ থেকে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের একটি টেসলা আমদানি করলে সর্বোচ্চ শুল্ক-করভার হবে ৮০ শতাংশ। আর ২৫ হাজার ডলার মূল্যের বিওয়াইডি বা একই শ্রেণির বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই হার ৬৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে ২০২৬ সালে তৈরি তিনটি মার্সিডিজ বেঞ্জ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি খালাস করেছে র‍্যানকন মোটরস লিমিটেড। ১ হাজার ৯৯৯ সিসির প্রতিটি গাড়ির বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এসব গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-কর দিতে হয়েছে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ হারে। এর বিপরীতে মাল্টা আমদানিতে করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে বিলাসবহুল গাড়ির চেয়েও একটি খাদ্যপণ্যের আমদানিতে বেশি কর দিতে হচ্ছে।

মাল্টার উচ্চ শুল্ক-করভার সরাসরি বাজারদরেও প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি আমদানি কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে মাল্টার দাম প্রতি কেজি ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমে বর্তমানে প্রায় ৪০০ টাকা কেজিতে নেমেছে। অথচ আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল প্রায় ৮৭ টাকা। সেই পণ্যের জন্যই শুল্ক-কর দিতে হয়েছে প্রায় ১০৭ টাকা। অর্থাৎ আমদানি পর্যায়ে পণ্যের মূল্যের চেয়েও করের পরিমাণ বেশি।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলমের মতে, বিশ্বের কোথাও ফল আমদানিতে এত বেশি শুল্ক-কর নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাল্টাসহ তাজা ফলের ওপর গাড়ির চেয়েও বেশি করভার রয়েছে।

গত দুই দশকে মাল্টার ওপর শুল্ক-কর ধাপে ধাপে বেড়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তখন প্রতি কেজিতে শুল্ক-কর দিতে হতো প্রায় ১২ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত করভার বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশে এবং প্রতি কেজিতে করের পরিমাণ হয় প্রায় ৩৮ টাকা।

এরপর ২০২২ সালের মে মাসে ডলার-সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়। এতে মাল্টার মোট শুল্ক-করভার বেড়ে প্রায় ১১৪ শতাংশে ওঠে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে করভার আরও বাড়িয়ে ১৩৬ শতাংশ করা হয়। এর প্রতিবাদে ফল আমদানিকারকেরা আন্দোলন করেন। পরে ২০২৫ সালের মার্চে বাড়তি শুল্ক-কর কিছুটা কমানো হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে মাল্টার মোট শুল্ক-করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে।

আন্তর্জাতিক তুলনাতেও বাংলাদেশের করভার বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে মাল্টার সাধারণ শুল্কহার প্রতি কেজিতে ১ দশমিক ৯ সেন্ট। আবার ১৬টি দেশ ও অঞ্চল থেকে সেখানে শুল্কমুক্ত সুবিধায় মাল্টা আমদানি করা যায়। মার্কিন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে যেসব দেশ থেকে মাল্টা আমদানি হয়েছে, সেসব চালানে গড় কার্যকর শুল্কহার ছিল ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে মাল্টার মোট শুল্ক-করভার প্রায় ২৩ গুণ বেশি। প্রতিবেশী ভারতেও মাল্টা আমদানিতে ৩০ শতাংশ মৌলিক শুল্কসহ মোট করভার প্রায় ৩৩ শতাংশ।

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির প্রচার সম্পাদক জুনায়েদুল হকের তথ্য অনুযায়ী, আগে এক কনটেইনার মাল্টা আমদানিতে শুল্ক-কর দিতে হতো প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা। এখন সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকা। তাঁর মতে, বাড়তি শুল্ক-কর ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

তবে উচ্চ করের কারণে আমদানি কমলেও সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টা আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার বছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

তাজা ফলের ওপর উচ্চ শুল্ক-কর কমানোর সুপারিশও রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এ বিষয়ে সুপারিশ করে। কমিশনের যুক্তি ছিল, খাদ্যপণ্য হিসেবে তাজা ফল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এবং জাতীয় শুল্কনীতিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কেবল জরুরি প্রয়োজনে সাময়িকভাবে আরোপের কথা বলা হয়েছে।

গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকাতে ফল আমদানি নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে শুল্ক-কর বাড়ানো হয়েছিল। তাঁর মতে, রিজার্ভ পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হওয়ায় স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় মাল্টার শুল্ক-কর যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাল্টায় উচ্চ করের বিপরীতে বিলাসবহুল গাড়ির কিছু শ্রেণিতে তুলনামূলক কম করভার বর্তমান শুল্ক কাঠামোর ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি সামনে আনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top