দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের পরিবারের আপস-মীমাংসার নথি আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তবে এই আপসনামা আদালত আমলে নেয়নি। শুনানি শেষে মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর হলেও গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে মামলাটির জামিন শুনানি হয়। শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান জানান, মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের আপস হয়েছে এবং সেই আপসের ভিত্তিতে দুই আসামির জামিন চাওয়া হয়েছিল। মামলার বাদী ও মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আদালতে উপস্থিত হয়ে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের জামিনে আপত্তি নেই বলেও জানান।
তবে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো মামলায় বাদীপক্ষের আপসনামা দেওয়ার আইনগত সুযোগ রয়েছে কি না, সেটি বিবেচনার বিষয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাদী ও আসামিরা নিকট আত্মীয় হওয়ায় আপসনামাটি কী পরিস্থিতিতে করা হয়েছে, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে জানান তিনি।
আদালত শুনানি শেষে মাকছুদা ইসলামের বয়স ও অসুস্থতার বিষয় বিবেচনা করে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। ফলে আপস-মীমাংসার নথি দাখিল হলেও এমপির জামিন হয়নি।
আপসনামায় যা বলা হয়েছে
আদালতে দাখিল করা আপসনামা অনুযায়ী, মরিয়ম ছিলেন গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বিয়ের পর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সঙ্গেও মরিয়মের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল।
নথিতে বলা হয়, গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে ঢাকায় গাজী নজরুল ইসলামের বাসায় মরিয়ম আত্মহত্যা করেন। পরে গাজী নজরুল ইসলামের ফোন পেয়ে বিকেল সাড়ে ৬টার দিকে সেখানে গিয়ে মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন মরিয়মের বাবা।
মেয়ের স্বামীর বাসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় সন্দেহের ভিত্তিতে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামসহ তিনজনের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন মরিয়মের বাবা। আপসনামায় বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে বাদী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি থাকবে না বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে আত্মীয়তার ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা এবং বিচারাধীন মামলায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার কথা আপসনামায় উল্লেখ রয়েছে। নথিতে আরও বলা হয়েছে, উভয়পক্ষ স্বেচ্ছায় ও নিজ জ্ঞানে, কারও প্ররোচনা ছাড়া এতে স্বাক্ষর করেছে। আপসনামাটি ২৯ সেপ্টেম্বর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়িত করা হয়।
যেভাবে মামলার সূত্রপাত
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম আক্তারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর রাতে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
মামলার এজাহারে মরিয়মের বাবা অভিযোগ করেন, জুন মাসে তাঁর মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁরা সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি বাসায় গাজী নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন। এজাহারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছিল।
মামলার পর আদালত গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামকে আবারও চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। রিমান্ড শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। মামলার অপর আসামি ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে ৩০ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে আপসনামা দাখিল হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর আদালত সেটি আমলে নেয়নি। ফলে মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে আপসের বিষয়টি সামনে এলেও মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদনও এদিন নাকচ হয়েছে।

