সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের বিরুদ্ধে করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় নিহত মরিয়ম খাতুনের পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে একটি আপসনামা দেওয়া হয়েছে। এতে গাজী নজরুল ও মাকছুদা জামিনে মুক্তি পেলে বাদী বা তাঁর পরিবারের কোনো আপত্তি থাকবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় করা মামলাটি আইনগতভাবে আপসযোগ্য নয়, রাষ্ট্রপক্ষের এমন বক্তব্যের পর আদালত আপসনামাটি আমলে নেননি। শুনানি শেষে মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর হলেও গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে আপসনামাটি উপস্থাপন করা হয়। মামলার বাদী ও মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁর উপস্থিতিতেই আপসনামাটি দাখিল করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। পরে আদালত আপসনামাটি গ্রহণ না করে দুই আসামির জামিনের বিষয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত দেন।
আপসনামায় মরিয়মের বাবা ও গাজী নজরুলের এক আত্মীয়কে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষ করা হয়েছে। দলিলে বলা হয়েছে, মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সঙ্গেও মরিয়মের সম্পর্ক ভালো ছিল এবং তাঁরা একসঙ্গে পারিবারিক জীবন পরিচালনা করছিলেন বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়।
দলিল অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাসায় মরিয়মের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। মরিয়মের বাবা জানান, গাজী নজরুলের ফোন পাওয়ার পর তিনি তাঁর বাসায় গিয়ে মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁর মেয়ের জামাইয়ের বাসায় ঘটনাটি ঘটায় প্রথমে সন্দেহের ভিত্তিতে গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা এবং আরও একজনকে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়েছিল। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় করা হয়।
আপসনামায় আরও বলা হয়েছে, মামলা করার পর বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতে মরিয়মের বাবা মনে করেছেন, গাজী নজরুল বা মাকছুদার কোনো প্ররোচনা কিংবা তাঁদের কোনো কার্যকলাপের কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি। দুই পক্ষের আগে থেকেই আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বলেও দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা বলা হয়।
সমঝোতার তিনটি শর্তের কথাও আপসনামায় উল্লেখ রয়েছে। প্রথমত, গাজী নজরুল ও মাকছুদা জামিনে মুক্তি পেলে বাদী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি থাকবে না। দ্বিতীয়ত, জামিনের পর দুই পক্ষ পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে। তৃতীয়ত, বিচারাধীন বিষয়ে উভয় পক্ষ নির্লিপ্ত থেকে বিচারকাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
তবে আদালতে আপসনামাটি উপস্থাপনের পর রাষ্ট্রপক্ষ এর আইনগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানায়। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারার এই মামলা আইন অনুযায়ী আপসযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও সেটির ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তি বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিন দেওয়ার সুযোগ নেই।
শুনানি শেষে আদালত বয়স ও নারী হওয়ার বিষয় বিবেচনায় মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। ফলে আপসনামায় তাঁর জামিনে বাদীপক্ষের আপত্তি না থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও সেটি তাঁর জামিন নিশ্চিত করেনি।
মরিয়মের মৃত্যুর পর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। পরে নজরুল ও মাকছুদাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলায় গাজী নজরুলকে দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়। তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে মরিয়ম, নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদার বসবাসের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে মামলার ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়।
অন্যদিকে, আপসনামা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও এসেছে। ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, আপস হয়ে থাকলেও তদন্তে এর প্রভাব পড়বে না। তদন্তে যে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে যাবে বলে তিনি জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, বাদী ও আসামিরা নিকটাত্মীয় হওয়ায় কোনো ধরনের চাপের কারণে আপসনামাটি তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে। তবে আপসনামায় দুই পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে মরিয়মকে বিয়ের পর গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মরিয়ম এসব বিষয়ে কথা বলতেন বলেও এজাহারে উল্লেখ ছিল। তবে পরবর্তী আপসনামায় মরিয়মের বাবা বলেছেন, নজরুল ও মাকছুদার প্ররোচনা বা কার্যকলাপের কারণে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেননি।

