পতাকা, সেনাবাহিনী, জাতীয় সংসদ সবই আছে; শুধু মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে দেশটা!

ইউরোপের মানচিত্রে আলাদা কোনো দেশ হিসেবে স্বীকৃতি নেই। নেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। অথচ নিজস্ব সরকার, জাতীয় পতাকা, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মুদ্রা ও ডাকটিকিট, সবই রয়েছে। পূর্ব ইউরোপের এই রহস্যময় ভূখণ্ডটির নাম ট্রান্সনিস্ট্রিয়া। মলদোভা ও ইউক্রেনের মাঝামাঝি অবস্থিত এই অঞ্চলটি সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাভেল ভ্লগার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের আগ্রহের কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সরকারিভাবে অঞ্চলটির নাম প্রিডনেস্ট্রোভিয়ান মলডেভিয়ান রিপাবলিক বা পিএমআর। ১৯৯০ সালে মলদোভা থেকে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দেয় ট্রান্সনিস্ট্রিয়া। পরে ১৯৯২ সালে মলদোভার সঙ্গে চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অঞ্চলটি কার্যত স্বশাসিত অবস্থায় চলে যায়। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এটি এখনো মলদোভার অংশ হিসেবেই বিবেচিত।

ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার বিশেষত্বের বড় একটি অংশ এর সোভিয়েত আমলের আবহ। রাজধানী তিরাসপোলের বিভিন্ন স্থানে লেনিনের মূর্তি, সোভিয়েত যুগের স্থাপত্য, স্মৃতিস্তম্ভ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাস্তে-হাতুড়ির প্রতীক এখনো দেখা যায়। এ কারণে পর্যটকদের অনেকে অঞ্চলটিকে সোভিয়েত সময়ের একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে দেখেন।

এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে সরাসরি বিমান চলাচলের ব্যবস্থা নেই। মলদোভার রাজধানী কিশিনাউ থেকে মিনিবাসে তিরাসপোল বা বেন্ডারে যাওয়া যায়। সীমান্ত চেকপয়েন্টে পাসপোর্ট পরীক্ষা করে পর্যটকদের বিশেষ প্রবেশপত্র দেওয়া হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও ও পোস্টের মাধ্যমে ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার পরিচিতি গত কয়েক বছরে বেড়েছে। ইনস্টাগ্রামের রিলস ও ইউটিউবের ট্রাভেল ভ্লগে এখানকার সোভিয়েত ধাঁচের শহর, স্থাপত্য ও জীবনযাত্রার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২০ সালের একটি হিসাবে বছরে প্রায় ২০ হাজার পর্যটক সেখানে যেতেন, যাদের বড় অংশ মলদোভা থেকে আসতেন। পর্যটকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ রুশ ও ইংরেজি ভাষায় ভ্রমণ নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।

ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার আরেকটি পরিচিতি এর আঙুরের ব্র্যান্ডি বা ওয়াইনের জন্য। অঞ্চলটির উর্বর মাটি, নাতিশীতোষ্ণ মহাদেশীয় জলবায়ু এবং কৃষ্ণসাগর ও দিনিস্টার নদীর নিকটবর্তী অবস্থান আঙুর চাষের জন্য অনুকূল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে ঘরে তৈরি ওয়াইন ও স্মোকড চিজও পাওয়া যায়।

রাজনৈতিকভাবে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। প্রায় ৪,১৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই এলাকায় মলডোভান, ইউক্রেনীয় ও রুশ জনগোষ্ঠীর বসবাস। রুশ, রোমান ও ইউক্রেনীয়, এই তিনটি সরকারি ভাষাও এখানকার জটিল ইতিহাসের প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বাইরে থাকা ট্রান্সনিস্ট্রিয়া এখন ইতিহাস, সোভিয়েত স্থাপত্য, ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তুলনামূলক কম খরচের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কারণে ইউরোপের কৌতূহলোদ্দীপক গন্তব্যগুলোর একটি হিসেবে পর্যটকদের নজর কাড়ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top