রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে আদালতে দুই কর্মকর্তার আইনজীবীরা পুলিশের অভিযোগের বিরোধিতা করেছেন।
গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ এবং লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা। গত রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার তাঁদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দুই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘিরে পুলিশের অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর # ১’ এবং ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশের অভিযোগ, এসব গ্রুপের মাধ্যমে সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হতো। একই সঙ্গে সহিংসতায় উসকানি দিতে পারে, এমন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হতো বলে দাবি তদন্তকারীদের।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় এসেছে। পুলিশের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং সংগঠিত রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগ
দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের আরেকটি কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রচার চালানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছে পুলিশ। আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজের কথা বলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এই পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা উসকে দিতে পারে, এমন কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছিল।
এ ছাড়া কাজী গুলশান আরার নামে থাকা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা সরকার এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও কুৎসামূলক প্রচার চালিয়ে আসছিলেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে এসব অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, কনটেন্টগুলো কোথা থেকে তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে এবং এর পেছনে অর্থের উৎস কী ছিল, তা খতিয়ে দেখতে চায় পুলিশ।
২০১৮ সালের রাজনৈতিক যোগাযোগও তদন্তে
গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টিও পুলিশের রিমান্ড আবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বরের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দিন জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে কাজী গুলশান আরাও উপস্থিত ছিলেন।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ১০১ জন সহযোগীকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশের দাবি, সংগঠনটির মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশের বিষয়টিও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় আরও ১০১ জন অজ্ঞাতনামা আসামি
দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা করেছে ডিবি। মামলায় তাঁদের পাশাপাশি আরও ১০১ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সহযোগীদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অন্য ওয়েবসাইট ও পেজ চিহ্নিত করা এবং ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন।
এ ছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা অবৈধ অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এসব বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
অভিযোগ অস্বীকার আইনজীবীদের
আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় দুই কর্মকর্তার আইনজীবীরা পুলিশের অভিযোগের বিরোধিতা করেন। কাজী গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, টক শোতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ আনা হলেও তাঁর মক্কেল কী বক্তব্য দিয়েছেন, যার ভিত্তিতে এমন অভিযোগ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
অন্যদিকে দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর অভিযোগগুলোকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলেও ঠিক কোন কাজের কারণে তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে রিমান্ড আবেদনে যথেষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ আদালতে বলেন, আসামিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে সাবেক সরকারের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়।

