দীর্ঘ ৩৪ বছর নিজের লিঙ্গপরিচয় গোপন রাখার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে তৃতীয় লিঙ্গের একজন সদস্য হিসেবে প্রকাশ করেছেন ওয়ালিদ ইসলাম। তিনি বর্তমানে কেনিয়ার নাইরোবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজের পরিচয় প্রকাশের পর কেউ তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করছেন, আবার কেউ করছেন নানা ধরনের মন্তব্য।
২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন ওয়ালিদ। সেখানে তিনি নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের ক্যাডার কর্মকর্তা এবং বিশ্বের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের কূটনীতিক হিসেবে দাবি করেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় গোপন রেখে চলার মানসিক চাপ এবং সমাজের নানা ধরনের বিরূপ আচরণের কথা তুলে ধরেন তিনি।
ওয়ালিদ জানান, নিজের পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি ও সংকটের মধ্যে ছিলেন তিনি। তাঁর আচরণ, কথা বলার ধরন এবং চলাফেরা নিয়ে বিভিন্ন সময় মানুষ নানা প্রশ্ন ও কটূক্তি করত। এমনকি পরিচিত কয়েকজন তাঁর পরিচয় জানার পর তাঁকে ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানিও করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ওয়ালিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের তেহরানে দায়িত্ব পালনের সময় মানব পাচারবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক বেনামি অভিযোগ পাঠানো হয়েছিল। এসব অভিযোগে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ পরিস্থিতিও নিজের পরিচয় প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে প্রভাবিত করে।
পরিবারের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া
ওয়ালিদের শৈশব কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও বেড়ে উঠেছেন যশোরে। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। বাবা ট্রাকচালক ছিলেন। ওয়ালিদের বয়স যখন ১০-১১ বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। এরপর মা আমিনা বেগম এবং দুই ভাই তাঁকে আগলে রাখেন।
পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন, লিঙ্গপরিচয়ের কারণে যেন তাঁকে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। ছোটবেলায় কয়েকবার স্থানীয় হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা তাঁকে তাঁদের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানিয়েছেন ওয়ালিদ। তবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেসব পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।
পড়াশোনায় মেধাবী ওয়ালিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। প্রথমবার বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে চাকরি পেলেও পরে ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। প্রায় নয় বছর ধরে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। নাইরোবির আগে ইরান, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরিচয় প্রকাশের পেছনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
ওয়ালিদের ব্যক্তিগত জীবনেও পরিচয়সংক্রান্ত সংকটের প্রভাব পড়েছে। একসময় একজনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা বিয়ের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ওই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে তিনি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নারী হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছায়নি। অস্ত্রোপচারের কিছু প্রক্রিয়াও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন সরকারি নথিতে তিনি নিজেকে পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বিসিএস পরীক্ষার সময় নারী-পুরুষের পাশাপাশি অন্য কোনো লিঙ্গপরিচয় উল্লেখ করার সুযোগও ছিল না। তিনি হিজড়া সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠেননি বলে এত দিন নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি।
পরিচয় প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মাসরুফ হোসেনও তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তবে কিছু মানুষ নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।
ওয়ালিদ জানিয়েছেন, পরিচয় প্রকাশের পর তিনি মানসিকভাবে অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা অবশ্য নতুন করে কোনো সমস্যার আশঙ্কা করছেন। তিনি মনে করেন, লিঙ্গপরিচয়ের কারণে কাউকে যেন সামাজিকভাবে হেয় হতে না হয়। ভবিষ্যতে পরিচয়সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই কূটনীতিক।

