মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জাদুঘর থেকে অপসারণ

বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসকে সামনে রেখে সম্প্রতি জাদুঘরটিকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে আগের তুলনায় দৃশ্যমানতা কমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দর্শনার্থীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কর্নারে শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে আগের মতো আলাদা উপস্থাপনা এখন আর চোখে পড়ে না। তবে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলা হয়নি। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃত ও সমন্বিতভাবে উপস্থাপনের জন্য নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরটি শুধু একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও প্রতীক। ১৯১৩ সালে ‘ঢাকা জাদুঘর’ নামে যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। জাদুঘরে ৯৩ হাজারের বেশি নিদর্শন নিবন্ধিত থাকলেও স্থান সংকটের কারণে চারতলা ভবনের ৪৬টি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে মাত্র চার হাজারের কিছু বেশি নিদর্শন। বাকি সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে স্টোরে।

সম্প্রতি জাদুঘর পরিদর্শনে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আগের মতো আলাদা গ্যালারি বা কর্নার না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা রায়হান কবীর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেখতে গিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, ৭ মার্চের ভাষণ বা ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ সালের আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনা খুঁজে পাননি। তার মতে, স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ধীরে ধীরে আড়াল করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

মিরপুরের দর্শনার্থী শাহনাজ পারভিন মিলাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। নওগাঁ থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী খাজামাত উদ্দিনও বলেন, বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আগের মতো দৃশ্যমান আয়োজন এখন আর তেমন নেই।

এ বিষয়ে জাতীয় জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান আসমা ফেরদৌসী জানান, বঙ্গবন্ধু কর্নার সাময়িকভাবে সরানো হলেও কোনো নিদর্শন নষ্ট করা হয়নি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু প্রতিকৃতি ও উপকরণ সরিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবও বলেন, ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে নয়, গবেষণাভিত্তিক ও ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ভূমিকা যথাযথ গুরুত্ব পাবে, পাশাপাশি স্বাধীনতার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরা হবে। এ লক্ষ্যে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জাদুঘরকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। নতুন উপস্থাপনায় ভিডিও, অডিও গাইড এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ইতিহাস তুলে ধরা হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম আরও সহজে ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এছাড়া শিশুদের জন্য বিশেষ গাইডেড ট্যুর ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

জাতীয় জাদুঘরের জায়গা সংকট নিরসনে নতুন ১০ তলাবিশিষ্ট অ্যানেক্স ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। সেখানে নতুন গ্যালারি ও সমকালীন শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে পৃথক ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের প্রস্তুতিও চলছে। আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরে র‍্যালি, প্রদর্শনী, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও জাদুঘর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top