নারী ও পুরুষের কোমরের মাপ কত ইঞ্চির বেশি হলে হতে পারে ভয়ানক অসুখ

শরীরের ওজন বা বডি মাস ইনডেক্স (BMI) স্বাভাবিক দেখালেও কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোমরের মাপকে ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কোমরের পরিধি যত বাড়ে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) দক্ষিণ এশীয়দের জন্য ব্যবহৃত মানদণ্ড অনুযায়ী, পুরুষের কোমরের পরিধি ৯০ সেন্টিমিটারের বেশি এবং নারীর ৮০ সেন্টিমিটারের বেশি হলে তা বাড়তি বিপাকীয় ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই মাপ যথাক্রমে প্রায় ৩৫.৪ ও ৩১.৫ ইঞ্চি। ফলে পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৫ ইঞ্চি এবং নারীর ক্ষেত্রে ৩১ ইঞ্চির কাছাকাছি কোমরের মাপকে বিশেষভাবে নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, যদিও এই নির্দিষ্ট মাপকে একা কোনো রোগের নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না।

কোমরের মাপের সঙ্গে রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে বড় পরিসরের গবেষণাও রয়েছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, কোমরের পরিধি প্রতি ১০ সেন্টিমিটার বাড়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার আপেক্ষিক ঝুঁকি প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। গবেষণায় আরও দেখা যায়, এই সম্পর্ক নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বিদ্যমান এবং সামগ্রিক শরীরের ওজনের পাশাপাশি কোমরের চর্বিও আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ৬ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাদের কোমরের পরিধি সবচেয়ে বেশি, তাদের তুলনায় কম কোমরের পরিধির মানুষের মধ্যে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কম ছিল। গবেষণায় কোমরের পরিধি প্রতি ১০ সেন্টিমিটার বাড়লে পুরুষদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪ শতাংশ এবং নারীদের প্রায় ৩.৪ শতাংশ বাড়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া যায়।

কোমর বড় হওয়ার সঙ্গে শুধু ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগ নয়, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের অস্বাভাবিকতা, ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়া এবং কিছু পেশি-হাড়ের সমস্যারও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আরেকটি গবেষণায়, বেশি কোমরের পরিধির সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া, হাইপারইউরিসেমিয়া, কোমরব্যথা ও জয়েন্টের ব্যথার মতো সমস্যার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে কোমরের মাপ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো পেটের ভেতরের অতিরিক্ত চর্বি। এই ধরনের চর্বি শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং ইনসুলিন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন কার্ডিওমেটাবলিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। ফলে শুধু ওজন কত, সেটি দিয়ে একজন মানুষের বিপাকীয় ঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা যায় না। গবেষণায় এমন মানুষদের মধ্যেও কোমরের পরিধি ও ডায়াবেটিসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যাদের বিএমআই ২৫-এর নিচে ছিল।

তবে কোমরের মাপ কোনো রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়। বয়স, উচ্চতা, জাতিগোষ্ঠী, শারীরিক গঠন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করাও প্রয়োজন। তাই কোমরের মাপ নির্দিষ্ট সীমার কাছাকাছি বা তার বেশি হলে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ, লিপিড প্রোফাইলসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাপনের অভ্যাস পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর বাংলাদেশসংক্রান্ত তথ্যেও দক্ষিণ এশীয়দের জন্য পুরুষের ক্ষেত্রে ৯০ সেন্টিমিটার এবং নারীর ক্ষেত্রে ৮০ সেন্টিমিটার কোমরের পরিধিকে বাড়তি ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুতরাং কোমরের মাপকে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমানোর অংশ হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top