গ্রামের মানুষকে টার্গেট করে তৈরি হচ্ছে অনলাইন জুয়ার ফাঁদ

স্মার্টফোনে কয়েকটি ক্লিক এবং সামান্য টাকা দিয়ে শুরু। এরপর ধীরে ধীরে সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন, ধার করা অর্থ এমনকি পরিবারের প্রয়োজনীয় টাকাও চলে যাচ্ছে অনলাইন জুয়ার পেছনে। শুরুতে ছোট অঙ্কের জয় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। আর একবার বড় অঙ্কের টাকা হারানোর পর সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আরও বেশি অর্থ নিয়ে খেলায় ফিরছেন অনেকে। এভাবেই অনলাইন জুয়া অনেকের জন্য বিনোদন থেকে পরিণত হচ্ছে ভয়াবহ আর্থিক ও মানসিক সংকটে।

সাম্প্রতিক তিন বছরে অনলাইন জুয়া ঘিরে আত্মহত্যার অন্তত ২৮টি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ২৮টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত না হওয়া ঘটনা কিংবা নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার না হওয়ায় কিছু ঘটনা এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে। ফলে সংখ্যাটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে অন্তত ছয়টি হত্যাকাণ্ড এবং স্বামীর জুয়া খেলার কারণে পারিবারিক কলহের জেরে এক নারীর আত্মহত্যার ঘটনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এর প্রভাব শুধু জুয়ায় অর্থ হারানো ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনেও এর প্রতিক্রিয়া পড়ছে।

নিহতদের বয়স, পেশা ও জেলার চিত্র

অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৬ থেকে ৩০ বছর এবং ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ব্যক্তিদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। তবে এতে শুধু তরুণরাই যুক্ত ছিলেন এমন নয়।

পেশার হিসাবে ছয়জন ছিলেন বেকার। চাকরিজীবী ও শ্রমিক ছিলেন পাঁচজন করে। ব্যবসায়ী চারজন এবং কৃষক তিনজন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী, প্রবাসী, আইনজীবী, রিকশাচালক ও ফটোগ্রাফারের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অনলাইন জুয়া কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

জেলাভিত্তিক হিসাবেও বিভিন্ন এলাকার চিত্র পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি চারটি ঘটনার খবর এসেছে ঠাকুরগাঁও থেকে। চট্টগ্রামে তিনটি এবং ঢাকা, গাইবান্ধা, রংপুর ও রাজশাহীতে দুটি করে ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া জয়পুরহাট, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ঝিনাইদহ, যশোর, টাঙ্গাইল, নাটোর, নীলফামারী, খুলনা, পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার ও পিরোজপুরে একটি করে ঘটনার কথা প্রতিবেদনে এসেছে।

গাইবান্ধার জাবেদ আলীর ঘটনা

২০২৬ সালের ১৯ জুলাই গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ৫৫ বছর বয়সী ভ্যানচালক জাবেদ আলীর মৃত্যুর ঘটনা এখানে উল্লেখ্যযোগ্য। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে তিনি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেন। পরে স্থানীয় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকেও ঋণ নেন। ঘটনার আগের রাতেও তিনি অনলাইন জুয়ায় অর্থ হারিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানায় পুলিশ। পরদিন তার মরদেহ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর কথা জানিয়েছিল।

জাবেদ আলীর ভাগনি রাশেদা বেগমের ভাষ্য ছিল, জুয়া খেলার কারণে ধার করতে করতে একপর্যায়ে ঋণ পাঁচ লাখ টাকায় পৌঁছায়। পরিবারের ধারণা, সেই ঋণের চাপ থেকেই তিনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

ছোট বাজি থেকে বড় ক্ষতি

অনলাইন জুয়ার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সহজলভ্যতা। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট থাকলেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে খেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, বিভিন্ন ড্র বা র‍্যান্ডম নম্বরভিত্তিক খেলা, স্লট, রুলেট, পোকার ও লাইভ ক্যাসিনোর মতো বিভিন্ন পদ্ধতিতে অর্থ বাজি রাখার সুযোগ রয়েছে।

অনেকের ক্ষেত্রেই শুরুটা হয় অল্প অর্থ দিয়ে। গাইবান্ধার ব্যবসায়ী রতন চন্দ্র দেবনাথের ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিল বলে তার প্রতিবেশীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়। স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি কখনো কখনো অল্প টাকা জিততেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময় হারতে থাকেন। পরে তার দোকানের আয়ও জুয়ার পেছনে যেতে শুরু করে।

পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে তার ঋণ সামাল দিতে ১০ হাজার, ২০ হাজার কিংবা ৫০ হাজার টাকা করে জোগাড় করেছিলেন বলে প্রতিবেশীদের ভাষ্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে তার দোকানে রাখা প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকাও জুয়ায় হারান। রতন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী ও একটি ছোট সন্তান রয়েছে। মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

গোপনীয়তা সংকটকে আরও গভীর করছে

অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই পরিবারকে বিষয়টি জানান না। ফলে সমস্যা ধরা পড়ে তখনই, যখন ঋণ বা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের নাহিদ রানার ক্ষেত্রেও পরিবার প্রথমে বিষয়টি জানত না বলে জানান তার বাবা। তিনি একটি সিগারেট কোম্পানিতে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। চাকরির পাশাপাশি গোপনে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে প্রতিবেশীদের ভাষ্য। ব্যক্তিগত অর্থের পাশাপাশি কোম্পানির বিক্রির টাকাও জুয়ায় হারানোর পর পাওনা অর্থের খোঁজে কোম্পানির লোকজন বাড়িতে এলে পরিবার বিষয়টি জানতে পারে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে তমাল রায়ের ঘটনাতেও একই ধরনের গোপনীয়তার কথা উঠে এসেছে। তার ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে পরিবারের কেউ জানতেন না যে তিনি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে পুলিশের উদ্ধার করা একটি নোটের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারে পরিবার।

সঞ্চয় থেকে ব্যবসার মূলধন, সবই ঝুঁকিতে

কক্সবাজারের একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা আরও বড় আর্থিক ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে। পরিবারের সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, এইচএসসি পাসের পর চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা ওই তরুণ কয়েক বছরে আট থেকে ১০ লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রথমে ৫০০ বা এক হাজার টাকা করে বাজি ধরতে শুরু করেন। পরে সঞ্চয় ও স্থায়ী আমানত ভেঙে জুয়ায় অর্থ ঢালতে থাকেন।

পরিবারের হিসাবে, এক বছরের মধ্যে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে নেওয়া টাকা এবং গাড়ি বিক্রি করে পাওয়া অর্থও জুয়ায় চলে যায় বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন। একপর্যায়ে তার মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি হয়েছিল বলেও জানায় তার পরিবার। পরে পরিবার তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং একা থাকা ও স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ায়।

আরেকটি কক্সবাজারের পরিবারের ক্ষেত্রে অনলাইন জুয়ার কারণে ব্যবসার মূলধন ক্ষতির কথা এসেছে। পরিবারের ওই তরুণ একটি মুদি দোকান ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। স্থানীয় কয়েকজনকে জুয়া খেলতে দেখে তারও আগ্রহ তৈরি হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে অল্প টাকা দিয়ে শুরু করলেও পরে ব্যবসার মূলধন ব্যবহার করতে থাকেন। এমনকি গ্রাহকদের লেনদেনের টাকাও ফেরত দিতে না পারার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিবার তাকে আবার ব্যবসায় দাঁড় করাতে তিন লাখ টাকা ঋণ করে দিয়েছিল বলে তার বড় ভাই জানান। কিন্তু দুই মাসের মধ্যেই সেই অর্থও শেষ হয়ে যায়। পরিবারের হিসাবে ওই তরুণ অন্তত সাত থেকে আট লাখ টাকা হারিয়েছেন; ব্যবসার টাকা শেষ হওয়ার পর আত্মীয় ও পরিচিতদের কাছ থেকেও ধার নেন।

কেন বারবার খেলায় ফিরছেন অনেকে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমানের মতে, অনলাইন জুয়া অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি আচরণগত আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। অনিশ্চিত সময়ে পুরস্কার বা জয়ের সম্ভাবনা একজন ব্যক্তিকে বারবার খেলায় ফেরার তাগিদ দিতে পারে। প্রথম দিকে ছোট অঙ্কের জয় আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। পরে অর্থ হারালে সেই ক্ষতি ফেরত পাওয়ার আশায় আরও বড় অঙ্কের বাজি ধরার প্রবণতা দেখা যায়, যাকে জুয়া-আসক্তির ক্ষেত্রে ‘চেজিং লস’ বলা হয়।

তার মতে, ঋণের চাপ, আর্থিক সংকট, সামাজিক লজ্জা, অপরাধবোধ এবং নিজেকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করার অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জুয়া ও ঋণের বিষয়টি গোপন রাখার প্রবণতা সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সৈয়দ জাহিদ হোসেনের মতে, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করছে।

প্রতিরোধে আইন ও নজরদারি

অনলাইন জুয়া ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমও চলছে। সিআইডির জানিয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত তিনটি মামলা তদন্ত করেছে সংস্থাটির সাইবার টিম। বিভিন্ন অভিযানে অনলাইন জুয়া চক্রের সঙ্গে যুক্ত এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনে সহায়তাকারীসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও বন্ধে সাইবার পুলিশ সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা সাইবার পেট্রোলিং পরিচালিত হচ্ছে। এ কাজে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

এদিকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ বিল পাস হয় এবং পরে তা জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ হিসেবে কার্যকর হয়। নতুন আইনে প্রচলিত জুয়ার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং, ভার্চ্যুয়াল ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া ও দূরবর্তী বেটিংয়ের মতো কার্যক্রমকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। জুয়ার উদ্দেশ্যে অর্থ লেনদেন, বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা, জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু আইন বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা দিয়ে অনলাইন জুয়ার সমস্যা পুরোপুরি মোকাবিলা করা কঠিন। একই সঙ্গে জুয়ার সহজ প্রবেশাধিকার, আর্থিক লেনদেনের পথ, প্রচারণা এবং আসক্তির সামাজিক ও মানসিক দিকগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে। দৈনিক এদিনের একটি মতামত লেখাতেও অনলাইন জুয়ার বিস্তার, তরুণদের এতে যুক্ত হওয়া এবং পরিবারে এর আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top