প্রভাবশালীর ছেলের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি, নজির স্থাপন করলেন বিচারপতি

রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মিমকে গাড়িচাপায় হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ১৭ বছর বয়সী কিশোরের জামিন আবেদন নাকচ করেছেন আদালত। রোববার ঢাকার শিশু আদালত-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন মামুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালতে কিশোরের পক্ষে জামিনের আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খানসহ অন্য আইনজীবীরা। তাঁরা আদালতে যুক্তি দেন, অভিযুক্ত কিশোর শিশু এবং সে গাড়ি চালাচ্ছিল না। আইনজীবীদের দাবি, ঘটনার সময় প্রকৃত চালক গাড়িতে ছিলেন এবং কিশোরের বিরুদ্ধে চালকের সঙ্গে থাকার বাইরে অন্য কোনো অভিযোগ নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার কথাও আদালতে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা এবং কিশোরের গাড়ি চালানোর অনুমতি বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। শুনানিতে সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়টিও উঠে আসে।

শুনানির সময় বিচারক বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে কিশোরকে চালকের আসন থেকে বের হতে দেখা গেছে এবং পুলিশও ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে বলে জানিয়েছে। এমন অবস্থায় দ্রুত জামিন পেলে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর পরও সহজে বেরিয়ে যাওয়ার একটি নেতিবাচক বার্তা তৈরি হতে পারে বলে আদালত মনে করেন। কিশোরদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিচারক মন্তব্য করেন।

এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর আদালত কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার জামিনের আবেদন করা হলেও কয়েক দফা শুনানির পর রোববার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। শুনানির সময় আদালত জানতে চান, কিশোর কতদিন ধরে আটক আছে। তার আইনজীবী জানান, তখন পর্যন্ত ১২ দিন সে আটক ছিল।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে। বারিধারার কূটনৈতিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মিম। এ সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত মেহেদীকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর সেখানে উপস্থিত লোকজন গাড়ির চালকের আসনে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে দেন। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ওই রাতেই তাকে চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হলে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। এরপর কিশোরকে আবার হেফাজতে নেওয়া হয় এবং আদালতের নির্দেশে তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই মোক্তাদীর ইসলাম ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় আকাশ মারক (৪৪) নামের একজনকে গাড়িচালক হিসেবে আসামি করা হলেও শুরুতে ওই কিশোরের নাম মামলায় ছিল না।

এদিকে কিশোরের আইনজীবী আদালতে জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে এবং পরিবার আদালতে এসে জামিনে আপত্তি করছে না। তবে আদালত জামিনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে শুধু পারিবারিক সমঝোতার বিষয়টি নয়, ঘটনার সামাজিক প্রভাব ও বিচারিক বার্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে কিশোরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top