বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর মাজার সংলগ্ন দিঘি থেকে একমাত্র জীবিত কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি কুমিরের আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যুর পর প্রশাসনের সিদ্ধান্তে প্রাণীটিকে দিঘি থেকে অপসারণ করা হয়। তবে এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাজারের প্রধান খাদেম ও স্থানীয়রা।
গত মঙ্গলবার রাতে প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ সিদ্ধান্তে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরদিন বুধবার দুপুরে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। বর্তমানে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে কুমিরটি সুস্থ অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার ও দিঘি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের পরিবার দেখাশোনা করে আসছে। তার দাবি, কুমিরটি শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং বাগেরহাটের ঐতিহ্য ও পর্যটন আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে, তাই বলে একটি ঐতিহাসিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া উচিত হয়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। তার মতে, নিরাপত্তা জোরদার করে কুমিরটিকে দিঘিতেই রাখা যেত। এ জন্য প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সহায়তায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব ছিল।
অন্যদিকে অনেক দর্শনার্থী কুমির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তারা মনে করেন, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সর্বাগ্রে বিবেচনা করা উচিত। দর্শনার্থীদের অনেকেই প্রস্তাব দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যদি কুমিরটিকে ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে দিঘির চারপাশে শক্তিশালী বেষ্টনী ও নিরাপদ দর্শনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার ২০০০ সালে বাংলাদেশে মিঠাপানির কুমির বিলুপ্ত ঘোষণা করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে কয়েকটি মিঠাপানির কুমির উদ্ধার হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কঠোর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাজারের দিঘিতে একটি সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।
বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানিয়েছেন, কুমিরটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হবে না, কারণ এটি মিঠাপানির প্রাণী। প্রাণীটির ভবিষ্যৎ আবাসস্থল সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেছেন, কুমিরটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে পরে তা জনসাধারণকে জানানো হবে। ফলে ঐতিহ্য, নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

